‘তিনি ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, কিন্তু তারা ছিল অমানুষ’: আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ২ জনের মৃত্যুদণ্ড, বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত ২৮
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বহুল প্রতীক্ষিত এ রায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “আবু সাঈদ দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন সামনে মানুষ আছে, তারা তাকে গুলি করবে না। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি—মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।”

গতকাল বৃহস্পতিবার জনাকীর্ণ আদালতে চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।


মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন দণ্ডিতরা

রায়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে একটি গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় মাধব।

এছাড়া ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বেরোবির সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহযোগী অধ্যাপক এবং ছাত্রলীগের এক শীর্ষ নেতাসহ পাঁচজনকে।

পাঁচ বছর, তিন বছরসহ বিভিন্ন মেয়াদে আরও ১৯ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, চিকিৎসক ও ছাত্রসংগঠনের নেতারাও রয়েছেন। প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলের হাজতবাসের সময়কে সাজা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

মোট ৩০ আসামির মধ্যে বর্তমানে ছয়জন কারাগারে আছেন; বাকি ২৪ জন পলাতক বলে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়।


আদালতের পর্যবেক্ষণ: ‘লক্ষ্যভিত্তিক ও পদ্ধতিগত আক্রমণ’

রায় পাঠের সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, এ হত্যাকাণ্ড ছিল লক্ষ্যভিত্তিক, পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ। আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যায় প্ররোচনা, সহায়তা, রাজনৈতিক নির্যাতন, ব্যক্তিগত দায়, সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং যৌথ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়—যা মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।

প্রসিকিউশন পক্ষ ২৫ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। আদালত জানান, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও উপস্থাপিত প্রমাণ বিশদভাবে পর্যালোচনা করে তিন বিচারক সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে ঘোষিত সাজাগুলো যুগপৎ কার্যকর হবে।


বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা

গত বছরের ২৭ আগস্ট মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ৩০ জুন অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় এবং ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। তদন্ত সংস্থা ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়।

গত জানুয়ারিতে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এরপর ৫ মার্চ রায়ের জন্য ৯ এপ্রিল দিন ধার্য করা হলেও নির্ধারিত সময়েই রায় ঘোষণা করা হয়। পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির প্রয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, কারণ এতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণের প্রশ্ন স্পষ্ট হয়েছে।


রায়ের পর আদালতকক্ষে উত্তেজনা

রায় ঘোষণার পর আসামিদের আদালতকক্ষ থেকে বের করে নেওয়ার সময় কিছু উত্তেজনা তৈরি হয়। কয়েকজন আসামি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এএসআই আমির হোসেন দাবি করেন, তিনি ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ পালন করেছেন এবং রায় মানেন না।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সংক্ষিপ্ত রায়ে দেখা যাচ্ছে তার মক্কেলরা একাধিক অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পেলে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।


চিফ প্রসিকিউটরের প্রতিক্রিয়া

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে গুলির সামনে দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বলেন, “রায়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। আপাতত আমরা সন্তুষ্ট। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে আপিল করা হবে।”


পরিবারের অসন্তোষ: ‘আরও কঠোর শাস্তি চাই’

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবুনপুর গ্রামে আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আরও কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল। মা মনোয়ারা বেগম জানান, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি তাদের।

ভাই রমজান আলী ও আবুল হোসেন বলেন, কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাজা তুলনামূলক কম হয়েছে বলে তাদের মনে হয়েছে। রায়ের কপি হাতে পেলে প্রসিকিউশনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আবু সাঈদের সহযোদ্ধা শামসুর রহমান সুমন বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রায় এলেও গুরুতর অপরাধে জড়িত কয়েকজনের ক্ষেত্রে শাস্তি লঘু হয়েছে বলে তাদের ধারণা। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান তিনি।


আইনি ও সামাজিক তাৎপর্য

বিশ্লেষকদের মতে, এ রায় শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়; এটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদস্যদের দণ্ডিত করা বিচারব্যবস্থার কঠোর বার্তা বহন করে।

তবে সামনে রয়েছে আপিল প্রক্রিয়া। আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে গেলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পেতে আরও সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে, আবু সাঈদ হত্যা মামলার এ রায় দেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *