নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ১২ মার্চ ২০২৬
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে নিজেদের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহসী এক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ‘ওয়েভার’ বা সাময়িক ছাড় চেয়েছে ঢাকা। মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারতকে দেওয়া ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বিশেষ সুবিধার আদলেই এই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
প্রেক্ষাপট: ভারতের জন্য মার্কিন ওয়েভার
গত ৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ভারতকে ৩০ দিনের জন্য একটি বিশেষ ছাড় দেয়। এর ফলে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল কেনার সুযোগ পায় ভারতীয় রিফাইনারিগুলো। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এই ‘কৌশলগত’ সিদ্ধান্ত নেয়।
আমীর খসরু-ক্রিস্টেনসেন বৈঠক: ঢাকার যুক্তি
বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন:
“আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, ভারতকে যদি বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার তেল কেনার সাময়িক অনুমতি দেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত। এই ওয়েভার পেলে আমাদের অর্থনীতি বড় ধরনের সাপোর্ট পাবে।”
মন্ত্রী আরও জানান, মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই অনুরোধ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং বিষয়টি ওয়াশিংটনে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন।
কেন রাশিয়ার তেল বাংলাদেশের জন্য জরুরি?
১. জ্বালানি নিরাপত্তা: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে কাতার বা অন্যান্য দেশ থেকে এলএনজি ও তেল আসার পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রাশিয়ার তেল এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। ২. সাশ্রয়ী মূল্য: বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম যখন ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে, তখন রাশিয়ার ডিসকাউন্টেড তেল বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে। ৩. শিল্প উৎপাদন: নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারলে রপ্তানিমুখী শিল্পখাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
বিশ্লেষণ: বড় বাধা কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অনুমতি (Waiver) ছাড়া রাশিয়ার সাথে তেলের লেনদেন করা বাংলাদেশের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে:
- সেকেন্ডারি স্যাংশন: সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তৃতীয় কোনো দেশের ওপর লেনদেনের কারণে ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ দিতে পারে।
- ব্যাংকিং জটিলতা: রাশিয়ার ব্যাংকগুলো সুইফট (SWIFT) থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় ডলারের পরিবর্তে অন্য কোনো মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে মার্কিন অনুমতির প্রয়োজন।
- বিমা ও শিপিং: পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর বিমা ছাড়া আন্তর্জাতিক রুটে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব।
উপসংহার ও ভবিষ্যৎ বার্তা
বাংলাদেশ এখন আর কেবল আমদানিকারক দেশ নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদীয়মান অর্থনীতি। ভারতের মতো বাংলাদেশও যদি এই ওয়েভার পায়, তবে তা হবে বর্তমান সরকারের একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো, রয়টার্স এবং মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (মার্চ ২০২৬)।
