গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। একদিকে ইরানের ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ বা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন হামলা, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই যুদ্ধে কে কী ব্যবহার করছে এবং কার প্রযুক্তি জয়ী হচ্ছে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ইরানের আক্রমণভাগ: ড্রোন ও হাইপারসনিকের দাপট
ইরান প্রধানত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির ওপর ভরসা করে এই যুদ্ধ পরিচালনা করছে।
- শাহেদ-১৩৬ (কামিকাজে ড্রোন): এগুলোকে বলা হয় ‘সস্তা কিন্তু কার্যকর’ অস্ত্র। ঝাঁকে ঝাঁকে এই ড্রোন পাঠিয়ে ইরান মূলত ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখতে চায়।
- ফাত্তাহ-১ (হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র): এটি ইরানের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস। শব্দের চেয়ে ৫ গুণ বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রটি গত কয়েক দিনের হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে। ইরানের দাবি, এটি যেকোনো রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
- এমাদ ও জোলফাগার: গত ৩ মার্চ ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের হামলায় এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
২. ইসরায়েলের ‘লৌহবর্ম’: দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা
ইসরায়েল মূলত তাদের মাল্টি-লেয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দিয়ে ইরানের আক্রমণ ঠেকাচ্ছে।
- আয়রণ ডোম (Iron Dome): স্বল্প পাল্লার রকেট ও ড্রোন ধ্বংস করতে এর জুড়ি নেই। দুবাই বিমানবন্দরের ওপর আজকের হামলায় ড্রোনের একটি বড় অংশ এই প্রযুক্তিতে ধ্বংস করা হয়েছে।
- অ্যারো-৩ (Arrow-3): এটি বায়ুমণ্ডলের বাইরে গিয়ে ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে আঘাত করে। সম্প্রতি ইরানের ছোড়া একাধিক এমাদ ক্ষেপণাস্ত্রকে অ্যারো-৩ মহাকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে।
- এফ-৩৫ আই আদির: এটি ইসরায়েলের অত্যন্ত গোপন ও শক্তিশালী স্টিলথ ফাইটার জেট। এই বিমানে চেপেই ইসরায়েলি পাইলটরা ইরানের রাডার ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সূক্ষ্ম হামলা (Precision Strike) চালাচ্ছে।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সহায়তা: শক্তির ভারসাম্য
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর তাদের সবচেয়ে আধুনিক কিছু অস্ত্র মোতায়েন করেছে।
- থাড (THAAD): এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইসরায়েল ও জর্ডান সীমান্তে মোতায়েন করা এই সিস্টেমটি ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় প্রধান ভূমিকা রাখছে।
- প্যাট্রিয়ট সিস্টেম: গত ৬ মার্চ কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে আসা ড্রোনগুলো ধ্বংস করতে প্যাট্রিয়ট ব্যবহৃত হয়েছে।
- টমাহক ক্রুজ মিসাইল: লোহিত সাগরে থাকা মার্কিন রণতরী থেকে ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টারে নির্ভুল আঘাত হানতে টমাহক ব্যবহার করা হচ্ছে।
রণকৌশল বিশ্লেষণ: কে জিতছে এই প্রযুক্তির লড়াইয়ে?
এই যুদ্ধের একটি বড় দিক হলো ‘ব্যয় বনাম কার্যকারিতা’ (Cost vs. Effectiveness)। ইরানের একটি শাহেদ ড্রোনের দাম মাত্র ২০ হাজার ডলার, কিন্তু সেটি ধ্বংস করতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের খরচ পড়ছে প্রায় ১ থেকে ২ মিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষণ: ১. ফাঁকিবাজি কৌশল: ইরান ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের রাডারগুলোকে ব্যস্ত করে ফেলে, আর সেই সুযোগে হাইপারসনিক বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়ে বড় ক্ষতি করার চেষ্টা করে। ২. আকাশে আধিপত্য: প্রযুক্তির দিক থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল সংখ্যা (Quantity) তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩. সাইবার যুদ্ধ: সশরীরে অস্ত্রের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দেশই একে অপরের ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হ্যাক করার চেষ্টা করছে।
উপসংহার
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের প্রায় ৮৫% থেকে ৯০% হামলা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। তবে ট্রাম্পের আজকের ঘোষণার পর যদি যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণশক্তিতে হামলা শুরু করে, তবে ইরানের মাটির নিচের গোপন ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলো (Missile Cities) ধ্বংস করতে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমার ব্যাপক ব্যবহার দেখা যেতে পারে।
