জামায়াত ও কওমি দ্বন্দ্বের সিলসিলা: আকিদা থেকে রাজনীতি, না কি রাজনৈতিক হিসাব?
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও কওমি মাদরাসাভিত্তিক দেওবন্দী ঘরানার আলেমদের একটি অংশের মধ্যকার মতবিরোধ। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী–এর কিছু লেখাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিরোধ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকিদাগত বিতর্ক ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিস্তৃত হয়েছে।

একদিকে কওমি আলেমদের একটি অংশ দাবি করছে—এ দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক নয়, বরং আকিদাগত। অন্যদিকে জামায়াতের নেতারা বলছেন—দলীয় আকিদা কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক; ব্যক্তিগত কোনো লেখকের মতামতকে দলীয় নীতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ফলে পুরোনো বিতর্ক নতুন প্রজন্মের মধ্যেও বিভিন্ন সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।


দ্বন্দ্বের সূত্রপাত: মওদুদীর লেখাকে কেন্দ্র করে আপত্তি

কওমিপন্থি আলেমদের অভিযোগ, জামায়াত প্রতিষ্ঠার আগেই মওদুদীর কিছু লেখায় কয়েকজন নবী ও সাহাবা (রা.) সম্পর্কে এমন কিছু ব্যাখ্যা ছিল, যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রচলিত আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নবীগণের নিষ্পাপত্ব ও সাহাবাদের মর্যাদা বিষয়ে তার কিছু বক্তব্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি রয়েছে। ফলে ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার পরও ওই আলেমরা দলটিকে সমর্থন করেননি। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশেও সেই বিরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

কওমিপন্থি একাধিক আলেমের মতে, এই বিরোধকে রাজনৈতিক বলে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়; বরং এটি মূলত ইলমি (জ্ঞানগত) ও আকিদাগত মতভেদ।


জামায়াতের অবস্থান: ব্যক্তিগত মত বনাম দলীয় নীতি

জামায়াত নেতারা অবশ্য দাবি করেন, দলীয় নীতি ও মওদুদীর ব্যক্তিগত ইজতিহাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই মওদুদীকে ফিকাহ বা আকায়েদের ইমাম হিসেবে উপস্থাপন করেনি।

তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম তার ‘ইকামতে দ্বীন’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিখেছেন—মওদুদীর কোনো বক্তব্য কোরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে যাচাই ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।

জামায়াতের দাবি, তাদের আকিদা হলো ইসলামের মৌলিক আকিদা—“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।” দলীয় কর্মীদের প্রধান পাঠ্যপুস্তক কোরআন ও হাদিস; রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা বিষয়ে মওদুদীসহ বিভিন্ন লেখকের বই থেকে সহায়ক জ্ঞান নেওয়া হয়।


কওমি অঙ্গনের বিভক্ত অবস্থান

যদিও কওমি অঙ্গনের একটি অংশ জামায়াতের বিরোধিতায় সোচ্চার, অন্য অংশ রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির সঙ্গে কাজ করছে।

উদাহরণস্বরূপ, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ–এর আমির শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যে বলেন, জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম। চট্টগ্রামের এক ধর্মীয় সমাবেশে তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানান।

তবে একই সময় কওমি ঘরানার আরেক প্রভাবশালী আলেম মামুনুল হক–এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি ইসলামি দল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্যে অংশ নেয়। পরবর্তীতে সেই ঐক্য সংসদে বিরোধী জোট হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে।

এতে স্পষ্ট হয়, কওমি অঙ্গন একক অবস্থানে নেই; বরং মতপার্থক্য অভ্যন্তরীণভাবেও রয়েছে।


‘ওয়ান বক্স পলিসি’ ও নির্বাচনি সমীকরণ

গত জাতীয় নির্বাচনের আগে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়—অর্থাৎ ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট একত্র করার উদ্যোগ। তবে আকিদাগত আপত্তির কথা বলে কিছু দল শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায়।

জামায়াতপন্থিদের অভিযোগ, নির্বাচনের ঠিক আগে জামায়াতবিরোধী ফতোয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। এর মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের দাবি—এটি ছিল ধর্মীয় অবস্থান স্পষ্ট করার প্রয়াস।


ঐক্যের প্রচেষ্টা: অতীত ভুলে সামনে এগোনোর আহ্বান

চব্বিশের জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে ইসলামি দলগুলোর নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি অতীতের আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে ঐক্যের আহ্বান জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল দ্বন্দ্ব প্রশমনের একটি বড় বার্তা। তবে তাতে সব পক্ষ একমত হয়নি। কেউ কেউ এটিকে কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন, আবার অনেকে আন্তরিকতার প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।


পাকিস্তান প্রসঙ্গ: ভিন্ন বাস্তবতা

জামায়াতপন্থি ও কিছু কওমি তরুণ আলেমের যুক্তি—পাকিস্তানে দেওবন্দী ধারার বড় দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী বহুবার জোটবদ্ধভাবে রাজনীতি করেছে। সেখানে আকিদাগত মতভেদ রাজনৈতিক সহযোগিতার অন্তরায় হয়নি।

তাদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় দ্বন্দ্বটি তীব্র আকার নিয়েছে।


তরুণ প্রজন্মের অবস্থান: দ্বন্দ্ব কমছে?

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জনপ্রিয় কওমি তরুণ আলেম জামায়াতে যোগ দেওয়ায় নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তাদের বক্তব্য—ইতিহাসভিত্তিক ইলমি ইখতিলাফকে রাজনৈতিক শত্রুতায় রূপ দেওয়া উচিত নয়। আলোচনার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি নিরসন সম্ভব।

তাদের দাবি, কওমি তরুণদের মধ্যে আগের তুলনায় জামায়াতবিরোধী অবস্থান কিছুটা শিথিল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারস্পরিক সংলাপ ও ব্যাখ্যা বিনিময়ের ফলে অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে।


মূল প্রশ্ন: আকিদা না রাজনীতি?

জামায়াত-কওমি দ্বন্দ্বের মূল প্রশ্নটি এখনো একই জায়গায়—এটি কি সত্যিই আকিদাগত বিরোধ, নাকি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা?

কওমি আলেমদের একটি অংশ মনে করেন, আকিদার প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই। অন্যদিকে জামায়াতের দাবি—তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ দলীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং ব্যক্তিগত লেখার ভুল ব্যাখ্যা থেকে বিতর্কের জন্ম।

বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় ব্যাখ্যার পার্থক্য রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশে গেলে তা দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির ভবিষ্যৎ ঐক্য নির্ভর করছে—এই মতপার্থক্য কতটা সংলাপের মাধ্যমে সমাধান হয় তার ওপর।


সামনে কী?

বর্তমানে দুই পক্ষের সম্পর্ক পুরোপুরি বৈরী নয়, আবার সম্পূর্ণ মসৃণও নয়। নির্বাচনি রাজনীতি, জোট-সমীকরণ এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার প্রশ্ন—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি জটিল।

তবে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ও সংলাপের সংস্কৃতি বাড়লে পুরোনো বিরোধ প্রশমিত হতে পারে—এমন আশা করছেন অনেকেই।

জামায়াত ও কওমি অঙ্গনের এই দীর্ঘ সিলসিলা শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছাবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আবারও তীব্র হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *