তেহরান, ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই একটি বড় কূটনৈতিক চাল চাললেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, ইরান তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর আর কোনো হামলা চালাবে না—যদি না সেই দেশগুলোর মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনো আক্রমণ চালানো হয়।
প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। তবে এই ঘোষণার পেছনে যেমন শান্তির বার্তা রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর কৌশলগত সমীকরণ।
প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রার্থনা ও শর্তযুক্ত শান্তি
এক ভিডিও বার্তায় পেজেশকিয়ান গত কয়েক দিনে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হওয়া হামলার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের শত্রু প্রতিবেশী দেশগুলো নয়, বরং ‘বহিরাগত শক্তি’। তবে তিনি একটি কড়া শর্তও জুড়ে দিয়েছেন—যদি কাতার, বাহরাইন বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, তবে সেই দেশগুলোকেও মাসুল গুনতে হবে।
বিশ্লেষণ: কেন এই কৌশল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পিছু হটা বা নমনীয়তা আসলে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে: ১. আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা রোধ: ইরান চায় না এই যুদ্ধে তার প্রতিবেশীরা সরাসরি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়াক। ক্ষমা চেয়ে এবং বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে তেহরান প্রতিবেশীদের নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করছে। ২. মনস্তাত্ত্বিক চাপ: প্রতিবেশীদের ওপর দায় চাপিয়ে ইরান আসলে পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রকেই বার্তা দিচ্ছে। ইরান বোঝাতে চাচ্ছে, যদি আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হয় তবে তার দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই বর্তাবে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: পেজেশকিয়ান বনাম আইআরজিসি (IRGC)
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ। একদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যখন শান্তির কথা বলছেন, অন্যদিকে ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এখনো চরম আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, মার্কিনিদের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ স্বপ্ন তারা পূরণ হতে দেবে না। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরানের আসল নিয়ন্ত্রণ এখনো আইআরজিসি-র হাতেই, তাই প্রেসিডেন্টের এই নমনীয় অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? (প্রেডিকশন)
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে সামনে কয়েকটি সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে:
- জ্বালানি সংকট: যদি এই সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কাতার ও অন্যান্য আরব দেশগুলো ইতিমধ্যে বিশ্ব বাজারে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করছে।
- ছায়াযুদ্ধের বিস্তার: ইরান সরাসরি হামলা বন্ধ করলেও হিজবুল্লাহ বা হুথিদের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলোকে ব্যবহার করে ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানা অব্যাহত রাখতে পারে।
- আঞ্চলিক জোটের পরীক্ষা: এখন দেখার বিষয় আরব দেশগুলো কী করে। তারা কি তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করবে, নাকি ইরানের হুঁশিয়ারিকে উপেক্ষা করে ওয়াশিংটনকে সমর্থন দেবে? তাদের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র।
উপসংহার: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই বার্তাটি মূলত একটি ‘ডি-এস্কেলেশন’ বা উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা। তবে যুদ্ধের ময়দানে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। যদি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর বড় কোনো হামলা চালায়, তবে এই ‘শান্তির বার্তা’ মুহূর্তেই ছাই হয়ে যেতে পারে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কবলে পড়তে পারে।
