ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ সামরিক হামলা
ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। শনিবার ভোরে শুরু হওয়া এই হামলায় রাজধানীর আকাশজুড়ে যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি এবং একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় সময় প্রায় ৯০ মিনিট ধরে চলা এই অভিযানে কারাকাস ছাড়াও মিরান্দা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ভেনিজুয়েলা সরকার।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের পর আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে এবং শহরের বিভিন্ন অংশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ট্রাম্পের নির্দেশেই সামরিক অভিযান
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশেই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। কয়েক মাস ধরেই ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। তিনি একাধিকবার মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন।
এই অভিযানের পর ট্রাম্প দাবি করেন, প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র। তার ভাষ্যমতে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে প্রথমে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের মার্কিন নৌজাহাজে করে নিউইয়র্কে স্থানান্তর করা হয়েছে।
জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি
মার্কিন হামলার পরপরই ভেনিজুয়েলায় জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দেশটির জাতীয় ভূখণ্ডে বহিঃসংকট ঘোষণা করেন এবং জরুরি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন। তিনি দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই ঘটনাকে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে এবং তার “প্রুফ অব লাইফ” বা বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিচার হতে পারে মাদুরোর
মার্কিন সিনেটর মাইক লি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করার পর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন। রুবিও তাকে জানিয়েছেন, মাদুরো আটক হওয়ার পর আপাতত ভেনিজুয়েলায় আর কোনো নতুন হামলা চালানো হবে না।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আটককৃত মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করা হতে পারে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের অভিযোগ
ভেনিজুয়েলা সরকার অভিযোগ করেছে, দেশটির বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ধ্বংস এবং কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভেনিজুয়েলার তেলের ওপর অবরোধ আরোপ করে আসছে এবং মাদুরো সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়িয়েছে।
সমুদ্রে অভিযান ও বিতর্ক
গত কয়েক মাসে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র একাধিক অভিযান চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনী মাদক পাচারের অভিযোগে দুই ডজনেরও বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও ভেনিজুয়েলা সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
অনেক দেশ এই ধরনের হামলাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
মাদুরোর আটক হওয়ার খবরে ভেনিজুয়েলার ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। দেশটির বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে নেতৃত্বে আনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেবে কি না—এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা।
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা এখনই বিবেচনা করতে হবে। তিনি মাদুরোর সাম্প্রতিক নির্বাচনকে “লজ্জাজনক” বলে মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হামলা এবং প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক দেশ পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং পুরো লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
