আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি এখন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। গতকাল বুধবার (১১ মার্চ) ভারত অভিমুখী থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এই অঞ্চলে উত্তেজনা চরম সীমায় পৌঁছেছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়া যুদ্ধ এখন সরাসরি সম্মুখ সমরে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে।
ঘটনার বিবরণ: ‘মায়ুরি নারি’ জাহাজে হামলা
গত বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের খলিফা বন্দর থেকে গুজরাটের কান্ডলা বন্দরের উদ্দেশে রওনা দেয় থাইল্যান্ডের ‘প্রেসিয়াস শিপিং’-এর মালিকানাধীন জাহাজ ‘মায়ুরি নারি’ (Mayuree Naree)। হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় জাহাজটি লক্ষ্য করে দুটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শী এবং থাই নৌবাহিনীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজের ইঞ্জিন রুমে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় চারপাশ।
হামলার পরপরই জাহাজটির নাবিকরা লাইফ বোটে করে সমুদ্র নামতে বাধ্য হন। ওমানের নৌবাহিনী দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ২০ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও, এখনও ৩ জন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তারা জাহাজের ক্ষতিগ্রস্ত ইঞ্জিন রুমের ভেতরে আটকা পড়েছেন।
ইরানের দায় স্বীকার ও সতর্কবার্তা
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, জাহাজটি তাদের সতর্কতা উপেক্ষা করে নিষিদ্ধ জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। উল্লেখ্য, ইরান গত সোমবার থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ঘোষণা করে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ওপর হামলা বন্ধ না করলে এই পথে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
ভারতের অবস্থান ও উদ্বেগ
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। নয়াদিল্লির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং নিরীহ বেসামরিক নাবিকদের জীবন বিপন্ন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” উল্লেখ্য, এই সংঘাতের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দুজন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির সিংহভাগ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি এই পথেই আসে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও তেলের বাজারে অস্থিরতা
এই ঘটনার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এশিয়ায় খাদ্য ও জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন বা জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে, তবে তাদের “নজিরবিহীন পরিণতি” ভোগ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইতিমধ্যে ইরানের ১৬টি মাইন স্থাপনকারী নৌযান ধ্বংস করেছে।
বিশ্লেষণ: কী হতে পারে আগামীতে?
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট:
১. জ্বালানি সংকট: ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প রুটের অভাবে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে। ২. সামরিক হস্তক্ষেপ: যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের নৌ-মহড়া বা এসকর্ট মিশন শুরু করতে পারে। ৩. বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা: লোহিত সাগরের পর এখন হরমুজ প্রণালিও অনিরাপদ হয়ে ওঠায় বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপসংহার: হরমুজ প্রণালিতে এই হামলা কেবল একটি জাহাজে হামলা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সংঘাত প্রশমন করতে না পারে, তবে ২০২৬ সাল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি অন্ধকার বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, দ্যা হিন্দু ও রয়টার্স (মার্চ ১১-১২, ২০২৬)।
