ইরানে মার্কিন হামলা বিশ্বকে বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে: রাশিয়া–চীনের সতর্কবাণী
ইরানে মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক সুবিধাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর রাশিয়া ও চীন একযোগে সতর্ক করেছে—এই ধরনের আগ্রাসন বিশ্বকে একটি বৃহত্তর ও ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে।
ইরানে মার্কিন হামলা: রাশিয়ার কড়া প্রতিক্রিয়া
ইরানে মার্কিন হামলাকে “একেবারেই অযথা আগ্রাসন” বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এ ধরনের হামলার কোনো আইনি ভিত্তি বা যৌক্তিকতা নেই।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকে পুতিন বলেন,“এটি ছিল সম্পূর্ণ অকারণ আগ্রাসন। ইরানের বিরুদ্ধে এমন হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।”
তিনি আরও যোগ করেন, রাশিয়া ইরানের জনগণকে সহায়তা করার চেষ্টা করছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ না করার জন্য কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন।
চীনের অবস্থান: “ভুল উদাহরণ” তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানে মার্কিন হামলা নিয়ে চীনও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন,“‘সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হুমকি’ দেখিয়ে হামলা চালানো একটি ভুল বার্তা দেয়।”
চীনের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক নজির তৈরি করে। ওয়াং ই জোর দিয়ে বলেন, সব পক্ষকে দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসতে হবে এবং সামরিক উত্তেজনা পরিহার করতে হবে।
রাশিয়া–চীনের যৌথ সতর্কবাণী
রাশিয়া জানিয়েছে, ইরানে মার্কিন হামলা বিশ্বকে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সীমার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। চীনও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছে। দুই পরাশক্তির মতে, এই হামলা শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাইরের শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে
ইরানে মার্কিন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যে জানা গেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনিকে লক্ষ্য করে চরম পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
রাশিয়া এ ধরনের সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করে জানিয়েছে, এতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ইরান–রাশিয়া কৌশলগত সম্পর্ক
ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার একটি ২০ বছরের কৌশলগত চুক্তি রয়েছে, যা গত বছর স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে এই চুক্তিতে সরাসরি কোনো সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি নেই।
ইরানে মার্কিন হামলার পরও রাশিয়া এখন পর্যন্ত ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
রাশিয়া কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের কথা বললেও সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের ক্ষোভ ও অসন্তোষ
ইরানে মার্কিন হামলার পর রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা নিয়ে ইরানের ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন,“আমরা রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নিরাপত্তা সহায়তা পাচ্ছি না।”
এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়, কৌশলগত মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে তেহরানে অসন্তোষ বাড়ছে।
রাশিয়ার অবস্থান: ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে
রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেছেন,“ইরানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অটুট রয়েছে। ইরানের আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার আছে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানে মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
রাশিয়া–চীন–পাকিস্তানের জাতিসংঘ প্রস্তাব
রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তান একযোগে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। প্রস্তাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাশিয়ার জাতিসংঘ প্রতিনিধি ভাসিলি নেবেঞ্জিয়া ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন,“আবারও মার্কিন মিথ্যা অজুহাতে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। ইতিহাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিছুই শেখেনি।”
বিশ্ব কোথায় দাঁড়িয়ে?
রাশিয়ার মতে, ইরানে মার্কিন হামলা বিশ্বকে একটি “অত্যন্ত বিপজ্জনক সীমানার” দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাইরের শক্তিগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
চীনও জানিয়েছে, এ ধরনের হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করবে এবং বৈশ্বিক শান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে।
রাশিয়ার মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন,“মার্কিন–ইরান সংঘর্ষ রাশিয়া–মার্কিন কূটনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে না। এগুলো আলাদা বিষয়।”
উপসংহার
সব মিলিয়ে, ইরানে মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। রাশিয়া ও চীনের সতর্কবাণী স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই সংঘাত যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তাহলে তা বিশ্বকে একটি বৃহত্তর ও ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এখনো সময় আছে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফেরার, তবে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে।
