ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ দাবি ট্রাম্পের, কিন্তু বাস্তবতা কী?
ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে “পূর্ণ যুদ্ধবিরতি” হয়েছে এবং তা আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কার্যকর হবে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই ঘোষণার পরও তেহরান ও তেল আবিব থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আসেনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌতূহল ও সংশয় একসঙ্গে বেড়েছে। কারণ বাস্তব পরিস্থিতি এখনো সংঘাতমুক্ত বলে মনে হচ্ছে না।
ট্রাম্পের ঘোষণা কী বলছে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন,
“ইসরায়েল ও ইরান এই যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছে। এটি হতে পারত বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ, কিন্তু তা হবে না। ঈশ্বর মধ্যপ্রাচ্যকে রক্ষা করুন।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে, ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধ এখানেই শেষ। তিনি আরও জানান, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে দুই পক্ষই এর কৃতিত্ব পাবে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্পের ঘোষণায় এখনো অনেক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
পটভূমি কী?
ট্রাম্পের এই ঘোষণা আসে ইরানের পক্ষ থেকে কাতারের আল উদাইদ এয়ার বেসে মিসাইল হামলার পর। ওই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। যদিও ট্রাম্প এই হামলাকে “দুর্বল আঘাত” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান,
“আমরা এখনো ইসরায়েলি হামলা ও ইরানি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শব্দ শুনছি। যুদ্ধবিরতির কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো নেই।”
এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধ আদৌ থেমেছে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইসরায়েলি হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
গত শনিবার ইসরায়েলের হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক সুবিধায় আঘাত হানে। ইসরায়েল ১৩ জুন থেকে ইরানে ধারাবাহিক হামলা শুরু করে, যাতে একাধিক ইরানি জেনারেল নিহত হন।
ইরান এই হামলাকে “অযথা আগ্রাসন” বলে অভিহিত করে এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় শতাধিক মিসাইল নিক্ষেপ করে ইসরায়েলে বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করে।
এই ধারাবাহিক হামলা–পাল্টা হামলাই ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক শিরোনামে নিয়ে আসে।
ট্রাম্পের ঘোষণার বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ট্রাম্প বলেন,
“যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে ইসরায়েল ও ইরান দু’পক্ষই প্রশংসা পাবে। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা বছরের পর বছর চলতে পারত।”
তিনি আরও জানান, ইরান যদি আঘাত বন্ধ করে, তাহলে ইসরায়েলও সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। তবে এই শর্তভিত্তিক বক্তব্য যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ওমর রহমান মনে করেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর ভাষায়,
“কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে কিনা, কূটনৈতিক আলোচনার ভবিষ্যৎ কী—এসব বিষয়ে কিছুই স্পষ্ট নয়।”
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, ট্রাম্প অতীতেও কূটনীতির আশ্বাস দিয়ে পরে ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থায় ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ বলা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ
আল জাজিরা মিডিয়া ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক লিকা মাকি জানান,
“ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।”
তাঁর মতে, ইরানের কাছে এখনো পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম ও প্রযুক্তি রয়েছে। চাইলে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে।
এই বাস্তবতা পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্বের কাছে হুমকি কেন বাড়ছে?
ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক উদ্দেশ্যে। কিন্তু ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলো তা মানতে নারাজ। তাদের মতে, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র পৌঁছালে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।
এই কারণেই ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতি কী বলছে?
যদিও ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু তেহরান ও তেল আবিব থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। পাল্টা হামলার হুমকি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
ট্রাম্প অবশ্য আশাবাদী কণ্ঠে বলেছেন,
“এটি ছিল যুদ্ধের শেষ। এখন শান্তির পথ খুলে গেছে।”
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, ইসরায়েল–ইরানে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলার জন্য আরও সময় ও স্পষ্টতা প্রয়োজন।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ঘোষণায় আশার আলো দেখা গেলেও বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধবিরতি টেকসই হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে—এই সংঘাত সত্যিই শেষ হয়, নাকি আবার নতুন রূপে ফিরে আসে।
