ইরানের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তেহরানের একটি সেতুতে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার ভয়াবহ পতনের প্রতিবাদে তেহরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়।
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

ভূমিকা

ইরান বর্তমানে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং জাতীয় মুদ্রার রেকর্ড পতনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন আর কেবল বিক্ষোভে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিবাদ ইরানের গণঅভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, যা দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক সংকটই আন্দোলনের মূল কারণ

ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতায় জর্জরিত। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এক ডলারের মূল্য ১৪ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ চরম সংকটে পড়ে। এই আর্থিক চাপ থেকেই সাধারণ জনগণ রাস্তায় নামতে শুরু করে।

আন্দোলনের সূচনা: ২৮ ডিসেম্বর

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের প্রধান বাজারগুলোতে প্রথম বড় আকারের বিক্ষোভ দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন। শুরুতে দাবি ছিল—

নিত্যপণ্যের দাম কমানো
মুদ্রার মান স্থিতিশীল করা
বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ

 

কিন্তু খুব দ্রুত এই আন্দোলন তেহরানের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভ থেকে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের ভাষা ও দাবিতে বড় পরিবর্তন আসে। অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি যুক্ত হয়—

ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসান
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পদত্যাগ
রাজনৈতিক সংস্কার

 

এ পর্যায়ে এসে আন্দোলন আর সাধারণ বিক্ষোভ না থেকে ইরানের গণঅভ্যুত্থান হিসেবে রূপ নিতে শুরু করে।

নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন

বিক্ষোভ দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী—

শত শত মানুষ নিহত
১০ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার
অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ

 

সরকারি তথ্য ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

৮ জানুয়ারি ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক ফোন যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মূল উদ্দেশ্য ছিল—

আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো
আন্তর্জাতিক নজর এড়িয়ে দমন-পীড়ন চালানো

 

এই সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আরও বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

২ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে ইরানকে সতর্ক করেন। তিনি জানান, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চললে যুক্তরাষ্ট্র নীরব থাকবে না।

এই বক্তব্যের পর ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আন্দোলন প্রায় সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

খামেনির কড়া হুঁশিয়ারি

৩ জানুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ আখ্যা দিয়ে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন। তার বক্তব্যের পর নিরাপত্তা বাহিনী আরও কঠোর অবস্থান নেয়, যা সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

বর্তমানে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো অচল হয়ে আছে। অর্থনীতি স্থবির, প্রশাসন চাপের মুখে এবং জনগণের ক্ষোভ চরমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার দ্রুত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে না আসে, তাহলে ইরানের গণঅভ্যুত্থান আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।

উপসংহার

ইরানে শুরু হওয়া সাধারণ বিক্ষোভ আজ আর কেবল অর্থনৈতিক আন্দোলন নয়—এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকেত। জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, দমন-পীড়ন এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা মিলিয়ে যে গণঅভ্যুত্থান গড়ে উঠেছে, তা দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন ইরানের দিকে, আর সময়ই বলে দেবে এই আন্দোলনের পরিণতি কোন পথে যায়।

দ্বারা Saimun Sabit

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।