ক্রিকেটে রাজনীতি: সিদ্ধান্তহীনতায় ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ ক্রিকেক্রিকেটে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আইপিএল–সংক্রান্ত জটিলতায় বাংলাদেশের ক্রিকেট নতুন করে বিতর্কের মুখে।
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

ক্রিকেটে রাজনীতি: বিচক্ষণতার অভাবে সংকটে বাংলাদেশ ক্রিকেট

ক্রিকেটে রাজনীতি—এই দুটি শব্দ এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ, আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানের খেলা এবং ভারতের সঙ্গে ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো যেভাবে নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ক্রিকেটপ্রেমী থেকে শুরু করে সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যেও।

মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একসময় বলেছিলেন, ‘ক্রোধে যার শুরু, লজ্জায় তার শেষ।’ এই উক্তিটি বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের সাম্প্রতিক আচরণের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। আবেগপ্রবণ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ যে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তার উদাহরণ এখন আমাদের সামনে।

ক্রিকেট বোর্ড, রাজনীতি ও সিদ্ধান্তের জটিলতা

বাংলাদেশে ক্রিকেট পরিচালনা করে ক্রিকেট বোর্ড, কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্তের শেষ কথা অনেক সময় আসে বোর্ডের বাইর থেকে। ক্রীড়া উপদেষ্টা, রাজনৈতিক বিবেচনা এবং তথাকথিত ‘জাতীয় সম্মান রক্ষাকারী’ গোষ্ঠীর চাপ—সব মিলিয়ে ক্রিকেটে রাজনীতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এ পরিস্থিতিতে ক্রিকেটের পেশাদার দিকটি অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আর্থিক লাভ-ক্ষতি—এসবের হিসাব না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আবেগের বশে।

মোস্তাফিজ–আইপিএল ইস্যু ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

আইপিএল নিলামে মোস্তাফিজুর রহমানকে ৯ কোটি রুপিতে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। কিন্তু এরপরই ভারতের কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেতার আপত্তিতে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি ওঠে, এমনকি মাঠ নষ্ট করার হুমকিও দেওয়া হয়।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই কেকেআরকে মোস্তাফিজকে না খেলানোর পথে ঠেলে দেয়। এখানে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল—বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের। কারণ নির্ধারণ না করে, কূটনৈতিক ও ক্রীড়া পর্যায়ের আলোচনা না চালিয়ে বিষয়টিকে আবেগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।

আইপিএল ও বিশ্বকাপ—দুটি ভিন্ন মঞ্চ

সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছে আইপিএল ইস্যুকে বিশ্বকাপের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা। আইপিএল একটি বেসরকারি লিগ, আর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আইসিসির টুর্নামেন্ট। দুটি আলাদা প্ল্যাটফর্ম, আলাদা কূটনৈতিক ও ক্রীড়া বাস্তবতা।

কিন্তু ক্রিকেটে রাজনীতি ঢুকে পড়ায় বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেন মোস্তাফিজের আইপিএল না খেলা মানেই দেশের ‘গোলামির’ প্রশ্ন। বাস্তবে খেলাধুলায় আবেগের চেয়ে যুক্তি ও কৌশল বেশি জরুরি।

বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত: কার লাভ, কার ক্ষতি?

বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না গেলে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে কার? বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোরই জয় হয়েছে দ্বিগুণ। তারা চেয়েছিল মোস্তাফিজ আইপিএলের বাইরে থাকুক—তা হয়েছে। তারা চেয়েছিল বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না যাক—সেটাও হয়েছে।

অন্যদিকে ক্ষতিটা হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের। আন্তর্জাতিক রাজস্ব, আইসিসির অর্থ বণ্টন, বৈশ্বিক উপস্থিতি—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অথচ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে তেমন কোনো খোলা আলোচনা হয়নি।

মত প্রকাশে ক্রিকেটাররাও চাপে

এই ইস্যুতে মত প্রকাশ করে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল পর্যন্ত ‘ভারতীয় দালাল’ তকমা পেয়েছেন। খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটেও। একপর্যায়ে স্থানীয় লিগ বর্জনের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত আসে।

এটি প্রমাণ করে, ক্রিকেটে রাজনীতি শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই নয়, দেশের ভেতরেও ক্রিকেট কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আইসিসি ও ভারতের প্রভাব

আইসিসির মোট রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে ভারত থেকে, যার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে বিসিসিআই। আইসিসির চেয়ারম্যানও ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ এককভাবে চাইলেই আইসিসিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবে না।

এ বাস্তবতা বুঝে কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। আবেগ নয়, দরকার ছিল কূটনৈতিক দক্ষতা।

ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ও আমাদের করণীয়

বিশ্বকাপে না গেলে দেশের ক্রিকেটের তেমন ক্ষতি হবে না—এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটের আর্থিক ভিত, আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ অনেকটাই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ওপর নির্ভরশীল।

ক্রিকেটে রাজনীতি কমিয়ে এনে যদি পেশাদার ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু প্রশাসনের নয়—পুরো দেশের ক্রিকেটকেই বহন করতে হবে।

উপসংহার

ক্রিকেট কোনো একদিনের আবেগের খেলা নয়; এটি পরিকল্পনা, কৌশল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমন্বয়। রাজনীতিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব না হলেও, ক্রিকেটের সিদ্ধান্তে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত খেলাটির ভবিষ্যৎ।

বিচক্ষণতা ছাড়া ক্রিকেটে নেওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মাঠের বাইরের মানুষকে খুশি করলেও মাঠের ভেতরের খেলাটিকে দুর্বল করেই ছাড়ে।

দ্বারা Saimun Sabit

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।