শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যা: সংঘর্ষ, অভিযোগ ও বিচার দাবির বিস্তারিত
শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যা নিয়ে স্থানীয় রাজনীতি ও জনমনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষের পর তাদের এক নেতাকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দ্রুত মামলা ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছে দলটি।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
নিহত ব্যক্তির নাম মাওলানা রেজাউল করিম। তিনি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি একটি ফাজিল মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক এবং স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। দলীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমানের দাবি, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে রেজাউল করিম প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার পেছনে বিরোধী দলের পরিকল্পিত ভূমিকা রয়েছে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে
স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, ঝিনাইগাতী উপজেলায় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার উদ্যোগে একটি নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও সমর্থকেরা সেখানে জড়ো হতে থাকেন।
অনুষ্ঠান শুরুর পর সামনের সারিতে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়।
সহিংসতা ও আহত হওয়ার ঘটনা
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সংঘর্ষ চলাকালে অনুষ্ঠানস্থলের সামনে থাকা শতাধিক চেয়ার ও কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এ সময় উভয় দলের অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
এই সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন মাওলানা রেজাউল করিম। প্রথমে তাঁকে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে শেরপুর সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
চিকিৎসা ও মৃত্যুর ঘটনা
চিকিৎসকেরা জানান, মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি মারা যান।
শেরপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক উপল হাসান বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
হত্যার অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সংঘর্ষের একপর্যায়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী রেজাউল করিমকে আলাদা করে ধরে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। শ্রীবরদী উপজেলার এক জামায়াত নেতা দাবি করেন, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত।
এ ঘটনায় শেরপুর-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী নূরুজ্জামান বাদল বলেন, শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। তিনি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং দ্রুত তদন্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
জামায়াতের আল্টিমেটাম ও প্রশাসনের ভূমিকা
জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমান জানান, খুব দ্রুত মামলা দায়ের করা হবে। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের গ্রেপ্তার না করা হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হলে তার দায় প্রশাসনকে নিতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গ্রামে শোকের ছায়া
বৃহস্পতিবার সকালে নিহত রেজাউল করিমের বাড়ি শ্রীবরদী উপজেলার গজরিপা ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি চলছে। গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী ভিড় করছেন বাড়িতে।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, রেজাউল করিম ছিলেন শান্ত স্বভাবের মানুষ। এলাকায় তাঁর যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তাঁর মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার চান এলাকাবাসী।
উপসংহার
শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যা শুধু একটি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নয়, এটি আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
