তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে: পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ
তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে—এই প্রশ্নটি বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণা জোরদার হয়েছে। শহরের টক শো থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকানেও এখন ভোটের আলোচনা চলছে।
তবে বাস্তবতা হলো, তরুণ নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় থাকলেও ভোটের মাঠে তারা এখনো পিছিয়ে রয়েছে। কেন এমনটি হচ্ছে, তার উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণ।
শহরের রাজনীতি বনাম প্রান্তিক ভোটের বাস্তবতা
তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে, তার একটি বড় কারণ হলো শহরকেন্দ্রিক রাজনীতি। শহরে রাজনৈতিক আলোচনা হয় মূলত টেলিভিশন বিতর্ক, ফেসবুক পোস্ট ও ইউটিউব লাইভে। কিন্তু গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের ভোটের রাজনীতি একেবারেই ভিন্ন।
খুলনা, রংপুর, গাজীপুর বা সাতক্ষীরার গ্রামাঞ্চলে ভোট মানে শুধু দলীয় প্রতীক নয়। এখানে ভোট নির্ধারিত হয়—
আত্মীয়তার সম্পর্ক
পারিবারিক প্রভাব
সামাজিক বিশ্বাস
দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ
এই জায়গাগুলোতে তরুণ রাজনীতিবিদদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
গবেষণা কী বলছে তরুণদের রাজনীতি নিয়ে?
তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে—তা বোঝার জন্য বিআইজিডি (BRAC University) মানুষের ভোট-আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে একাধিক গবেষণা পরিচালনা করেছে।
২০২৫ সালের জুনে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়—
বিএনপি: ১২%
জামায়াতে ইসলামী: ১০.৪%
আওয়ামী লীগ: ৭.৪%
এনসিপি: মাত্র ২.৮%
এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায়, জনপ্রিয়তার দৌড়ে প্রবীণ রাজনৈতিক দলগুলোই এগিয়ে আছে।
দলীয় সংকট ও নেতৃত্বের আস্থাহীনতা
তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে, তার আরেকটি বড় কারণ হলো দলীয় অভ্যন্তরীণ সংকট। বিশেষ করে জোট রাজনীতির পর অনেক নতুন রাজনৈতিক দলে দেখা গেছে—
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন
নারী ও পুরুষ নেতাদের পদত্যাগ
আদর্শিক দ্বন্দ্ব
মাঠপর্যায়ে দুর্বল সংগঠন
এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে দলগুলোর ভবিষ্যৎ ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে দৃশ্যমান, মাঠে অনুপস্থিত
অনেক তরুণ রাজনৈতিক দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয়। ফেসবুক পোস্ট, লাইভ আলোচনা ও অনলাইন ক্যাম্পেইনে তারা আলোচনায় থাকে। কিন্তু বাস্তব ভোটের মাঠে তাদের উপস্থিতি সীমিত।
একজন স্থানীয় সাংবাদিকের ভাষায়,
“তারা ফেসবুকে খুব সক্রিয়, কিন্তু মাঠে দেখা যায় না। রাজনীতি শুধু পোস্টে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোতেই।”
এটাই তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে—তার অন্যতম বাস্তব কারণ।
অভিজ্ঞতা বনাম বয়স: প্রান্তিক ভোটারের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চোখে বয়স ও অভিজ্ঞতা এখনো যোগ্যতার বড় মানদণ্ড। অনেক এলাকাতেই শিক্ষিত তরুণদের গুরুত্ব কম।
গাজীপুরের এক শিক্ষক বলেন,
“এই এলাকায় শিক্ষিত তরুণদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। অভিজ্ঞতার অভাব তাদের দুর্বল করে।”
এ কারণে তরুণ নেতাদের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে।
পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর শক্ত শিকড়
বিএনপি ও জামায়াতের মতো পুরোনো দলগুলোর স্থানীয় শিকড় এখনো শক্ত। দীর্ঘদিন ধরে তারা—
মানুষের খোঁজখবর নেয়
বিপদে পাশে দাঁড়ায়
সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলে
খুলনার এক প্রবীণ ভোটারের ভাষায়,
“আমরা যাদের চিনি, তাদেরই ভোট দিই। নতুনদের কথা ভালো লাগলেও ভরসা আসে না।”
তরুণদের রাজনীতি পিছিয়ে থাকার মূল কারণগুলো (সংক্ষেপে)
মাঠপর্যায়ে সীমিত উপস্থিতি
সংগঠনের দুর্বলতা
নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার অভাব
প্রান্তিক সংস্কৃতি না বোঝা
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পদত্যাগ
বড় রাজনৈতিক দলের চাপ ও অপপ্রচার
কী করলে তরুণদের রাজনীতি এগোতে পারে?
তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে, তার সমাধানও আছে। এজন্য প্রয়োজন—
শহরকেন্দ্রিক রাজনীতি ছেড়ে গ্রামে যাওয়া
মানুষের জীবনের সমস্যাকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়া
স্থানীয় সংস্কৃতি বোঝা
সংগঠন শক্ত করা
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
নির্বাচনের বাইরেও মানুষের পাশে থাকা
রাজনীতি কেবল নির্বাচন বা অনলাইন আলোচনার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনের অংশ।
উপসংহার
সব বিশ্লেষণ মিলিয়ে বলা যায়, তরুণদের রাজনীতি যে কারণে ভোটের মাঠে পিছিয়ে, তা মূলত মাঠপর্যায়ের দুর্বলতা ও মানুষের আস্থাহীনতার ফল। তবে তরুণদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, সাহস ও সততা এখনো একটি বড় শক্তি।
যদি তরুণ রাজনৈতিক দলগুলো বাস্তব মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তবে তারা ভবিষ্যতে একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারবে।
