বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জের জের: বেড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকাজাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, যেখানে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জে বাড়ছে বিদ্যুৎ খাতের চাপ

বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক চাপ তৈরি করে রেখেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে এর বড় সুফল পাওয়া যায়নি। বরং এক বছরের ব্যবধানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ও কেন্দ্রভাড়া দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।

ক্যাপাসিটি চার্জ কী এবং কেন এটি বিতর্কিত

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সরকারি ও বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেনে। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক—প্রতিটি কেন্দ্রকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এই অর্থই পরিচিত ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া হিসেবে।

সমস্যা হচ্ছে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হলেও অলস বা অব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যও নিয়মিত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এ কারণেই ক্যাপাসিটি চার্জকে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত বলা হচ্ছে।

এক বছরে কীভাবে বেড়েছে কেন্দ্রভাড়া

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী—

২০২২–২৩ অর্থবছর
উৎপাদন সক্ষমতা: ২৪,৯১১ মেগাওয়াট
কেন্দ্রভাড়া: ২৫ হাজার কোটি টাকা
২০২৩–২৪ অর্থবছর
উৎপাদন সক্ষমতা: ২৮,০৯৮ মেগাওয়াট
কেন্দ্রভাড়া: ৩২ হাজার কোটি টাকা
২০২৪–২৫ অর্থবছর
উৎপাদন সক্ষমতা কমে: ২৭,৪১৪ মেগাওয়াট
কেন্দ্রভাড়া বেড়ে: ৪২ হাজার কোটি টাকা

অর্থাৎ, উৎপাদন সক্ষমতা কমলেও এক বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা

ডলার সংকট ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব

বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ডলারের দাম বৃদ্ধি। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং বিদেশি ঋণে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কিস্তি ডলারে পরিশোধ করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে—

২০২৩ সালের শুরুতে ডলারের দাম ছিল ১০৯ টাকা
২০২৪ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকায়

এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে পিডিবির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

গ্যাস কমে কয়লার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি

দেশে সবচেয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় গ্যাস থেকে। কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী—

গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে ৪৮% থেকে ৪৪%
কয়লা থেকে উৎপাদন বেড়ে ২০% থেকে প্রায় ২৭%

কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্যাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।

অতিরিক্ত সক্ষমতা ও আর্থিক ক্ষতি

সরকারি পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বা অলস বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এই অলস সক্ষমতার পেছনেই বছরে গড়ে ১১ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে নিরাপদ রিজার্ভ মার্জিন ১৫–২৫ শতাংশ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশে এই হার ৫০ শতাংশের বেশি, যা ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে লোকসান ও ভর্তুকি

২০২৪–২৫ অর্থবছরে পিডিবির মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। অথচ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ১২ টাকার বেশি, বিক্রি করা হচ্ছে মাত্র ৭ টাকায়।

এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ও ভর্তুকির চাপ বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

সমাধানের পথে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জ কমাতে হলে—

অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্বিবেচনা
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল

বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নতুন করে দর–কষাকষি
স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত বিদ্যুৎ পরিকল্পনা

এই পদক্ষেপগুলো দ্রুত নেওয়া জরুরি।

দ্বারা Saimun Sabit

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।