ধর্মের নামে রাজনীতি করে ভোট আদায়ের প্রতীকী চিত্রধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতীকী উপস্থাপন
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

ধর্মের নামে রাজনীতি: সমস্যা ধর্মে নয়, অপব্যবহারেই সংকট

ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও আত্মিক শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু ইতিহাস বলে, ধর্মের নামে রাজনীতি যখন শুরু হয়, তখন সেই ধর্মই অনেক সময় ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফলে সংকট তৈরি হয় ধর্মে নয়, বরং ধর্মকে ব্যবহারকারী রাজনৈতিক শক্তির কারণে।

প্রাচীন ইতিহাসে ধর্ম ও ক্ষমতার সম্পর্ক

তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন ফারাও। কিন্তু বাস্তব ক্ষমতা ছিল ধর্মীয় পুরোহিতদের হাতে। দেবতার অনুমোদনের অজুহাতে তারা রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করত। যুদ্ধ, কর আরোপ কিংবা নির্মাণকাজ—সবকিছুর বৈধতা আসত ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে। এখানেই প্রথম দেখা যায় কীভাবে ধর্মের নামে রাজনীতি রাষ্ট্রক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

পাকিস্তান অধ্যায়: রাজনৈতিক বৈধতার সংকট 

গত শতকের পাকিস্তানেও একই চিত্র দেখা গেছে। ১৯৪০–৫০ দশকে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছিল। আহমদিয়াবিরোধী আন্দোলন ছিল মূলত ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। ১৯৪৯ সালের ‘অবজেকটিভ রেজুলেশন’ রাষ্ট্র ও ধর্মের সীমারেখা মুছে দেয়। অনেক গবেষকের মতে, এখান থেকেই পাকিস্তানে ধর্মের নামে রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।

আধুনিক বিশ্বেও একই প্রবণতা

এই প্রবণতা শুধু মুসলিম সমাজেই সীমাবদ্ধ নয়। আজকের যুক্তরাষ্ট্রেও ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ শক্তিশালী হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বই নিষিদ্ধ করা, শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত—সবই হচ্ছে ধর্মীয় শুদ্ধতার নামে। রাজনীতি ও ধর্ম যখন হাত ধরাধরি করে চলে, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।

ধর্ম বনাম ধর্মের অপব্যবহার

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ধর্ম কখনোই মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে বলে না। ধর্ম বৈষম্য শেখায় না, নারীদের গৃহবন্দী করে রাখার নির্দেশ দেয় না। কিন্তু ধর্মের নামে রাজনীতি করা গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মতকে একমাত্র সত্য হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায়। এর ফল ভোগ করে সংখ্যালঘু, নারী ও ভিন্নমতাবলম্বীরা।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট ও বর্তমান বাস্তবতা 

আজকের বাংলাদেশেও ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। কিছু রাজনৈতিক শক্তি ভোটের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসকে জুড়ে দিচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, সামাজিক মাধ্যমে উসকানি, সংস্কৃতিচর্চার ওপর হুমকি—সবকিছুর পেছনেই একই মানসিকতা কাজ করছে। ইতিহাস প্রমাণ করে, ধর্মের নামে রাজনীতি সমাজে বিভাজন বাড়ায়, ঐক্য নয়।

নারী ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দ্বন্দ্ব 

নারীর অধিকার এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার। আফগানিস্তানের উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। সেখানে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অজুহাতে মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মজীবন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশেই নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়। ধর্ম নয়, বরং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাই এখানে মূল সমস্যা।

প্রতিবাদের শক্তি ও সামাজিক প্রতিরোধ

ভাগ্য ভালো যে সমাজ সব সময় নীরব থাকে না। জয়পুরহাটে মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধের চেষ্টা কিংবা নারায়ণগঞ্জে লালন মেলার বিরোধিতা—সব ক্ষেত্রেই সামাজিক প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, সম্মিলিত প্রতিবাদ ধর্মের নামে রাজনীতি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সমাধানের পথ কী?

সমাধান জটিল নয়। ধর্ম নিয়ে কথা বলার একচ্ছত্র অধিকার কোনো গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা এবং রাজনীতি ও ধর্মের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা বজায় রাখা। রাষ্ট্র যখন নিরপেক্ষ থাকে, তখনই ধর্মও তার পবিত্রতা রক্ষা করতে পারে।

Conclusion

সমস্যা ধর্মে নয়—সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ধর্মকে ক্ষমতার মই বানানো হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে একই ভুল বারবার ফিরে আসবে। তাই আজ প্রয়োজন সচেতন নাগরিক কণ্ঠ, যারা উচ্চস্বরে বলবে—ধর্মের নামে রাজনীতি নয়, রাজনীতিতে ন্যায় ও মানবিকতা চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *