আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি: বছরে ৫–৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আদায়ের অভিযোগ
আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি। কমিটির দাবি, ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি পরিশোধ করছে। এই চুক্তিকে দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর চুক্তিগুলোর একটি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্যরা এসব তথ্য তুলে ধরেন। এর আগে ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।
আদানির বিদ্যুৎ চুক্তিকে ‘সবচেয়ে খারাপ’ বলছে কমিটি
পর্যালোচনা কমিটির মতে, বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় করা বিদ্যুৎ চুক্তিগুলোর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি ডেকে আনছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে ক্ষতি হলে সেই দায়ও বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে।
কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম যখন প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট ছিল, তখন আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয় ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট দরে। এই অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দেওয়া হচ্ছে।
বছরে ৪০–৫০ কোটি ডলার বাড়তি পরিশোধ
প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানির বিদ্যুৎ চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা। ২৫ বছরের চুক্তি মেয়াদে এই বাড়তি অর্থের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার।
কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে আদানির সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ রয়েছে। তবে এটি একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা নির্বাচিত সরকারকেই নিতে হবে।
চুক্তি বাতিলে স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকির আশঙ্কা
মোশতাক হোসেন খান আরও বলেন, আদানির চুক্তি বাতিলের পথে গেলে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে সাময়িকভাবে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বার্থ রক্ষায় জনগণকে এই ত্যাগ স্বীকারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তার ভাষায়, “২৫ বছরের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে কিছু কষ্ট মেনে নিতেই হবে।”
দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে পর্যালোচনা কমিটি
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গেছে। কমিটির মতে, এ ধরনের চুক্তি দুর্নীতি ছাড়া সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে দুর্নীতিবিরোধী কমিশন (দুদক) ও উচ্চ আদালতে সংশ্লিষ্ট তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ দুর্নীতি মামলার বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ দিয়েছে, যারা প্রাপ্ত তথ্য যাচাই–বাছাই করছে।
‘বিদ্যুৎ বিদেশে, ঝুঁকি বাংলাদেশে’
জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে—“বিদ্যুৎ বিদেশে উৎপাদিত হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি বাংলাদেশের ওপর।” চুক্তিতে স্থান নির্বাচন, দাম নির্ধারণ ও শর্ত আরোপ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুতে কক্সবাজারের মহেশখালী ও ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডা—দুটি স্থান আলোচনায় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কীভাবে গোড্ডা বেছে নেওয়া হলো, সে বিষয়ে সরকারি নথিতে কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।
বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে লোকসান
পর্যালোচনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণ বাড়লেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বেড়েছে ১১ গুণ। ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ক্রমেই বড় লোকসানের দিকে যাচ্ছে।
২০১৫ সালে যেখানে পিডিবির লোকসান ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, সেখানে বর্তমানে তা ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সংস্কার না হলে এই সংকট স্থায়ী রূপ নেবে বলে সতর্ক করেছে কমিটি।
অলস বিদ্যুৎ সক্ষমতায় বাড়তি বোঝা
কমিটির হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা কার্যত অলস পড়ে আছে। অথচ এই অলস সক্ষমতার জন্য প্রতিবছর কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে ৯০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো এমনভাবে করা হয়েছে—লাভটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর, আর ঝুঁকিটা পুরো সমাজের ওপর।
Conclusion
সব মিলিয়ে আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে দীর্ঘমেয়াদে এর বোঝা সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
