হাদি হত্যা মামলায় ফয়সালের টাকা ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের নামে থাকা ৫৩টি ব্যাংক হিসাবে জমা মোট ৬৫ লাখ ৫০ হাজার ২৪৬ টাকা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন আদালত।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ সিআইডির আবেদনের শুনানি শেষে ফয়সালের ব্যাংক হিসাবগুলো ফ্রিজ করার নির্দেশ দেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের আদেশ ও সিআইডির আবেদন
সিআইডির উপ-পরিদর্শক আব্দুল লতিফ আদালতে দাখিল করা আবেদনে উল্লেখ করেন, হাদি হত্যা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অনুসন্ধানকালে এসব হিসাবে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডির আবেদনে আরও বলা হয়, এসব লেনদেন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই তদন্তের স্বার্থে অর্থ স্থানান্তর বা আত্মসাতের ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংক হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করা জরুরি।
মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ ও আইনগত দিক
আবেদনে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) অনুযায়ী ফয়সালের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খুন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের সংশ্লিষ্টতার আলামত পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।
আইন অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালে যদি অর্থ পাচার বা অর্থ গোপনের আশঙ্কা থাকে, তাহলে আদালত সংশ্লিষ্ট হিসাব অবরুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। সে বিবেচনায় আদালত হাদি হত্যা মামলায় ফয়সালের টাকা ফ্রিজ করার নির্দেশ দেন।
চার্জশিট ও গ্রেপ্তারের তথ্য
এদিকে হাদি হত্যা মামলায় ফয়সাল করিম মাসুদ ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিসহ মোট ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে বর্তমানে ১১ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির, মা মোসা. হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপুসহ একাধিক সহযোগীর নাম রয়েছে। এছাড়া অর্থ ও পালিয়ে যেতে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
পলাতক আসামিদের অবস্থা
মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ, সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পি, মোটরসাইকেল চালক আলমগীরসহ কয়েকজন এখনও পলাতক রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিবরণ
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর মতিঝিলে জুমার নামাজ শেষে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাচ্ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে পল্টন থানাধীন বক্স কালভার্ট এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলযোগে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে এবং এরপর সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
মামলার বর্তমান অগ্রগতি
হাদির মৃত্যুর পর পল্টন থানায় দায়ের করা মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে হাদি হত্যা মামলায় ফয়সালের টাকা ফ্রিজ সংক্রান্ত আদালতের আদেশ মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
