হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি: মার্কিন আঘাতের পাল্টা ইরানের কঠোর অবস্থান
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি দিয়ে ইরান বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন সামরিক আঘাতের পর তেহরান এই কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়বে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানির প্রধান পথ এটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি বাস্তবে রূপ নিলে—
তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে
জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হবে
বিশ্ব মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে
উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
ইরানের পার্লামেন্ট ও সামরিক অবস্থান
ইরানের পার্লামেন্ট ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার ও সংসদ সদস্য ইসমাইল কোসারি বলেন,
“হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা এখন আমাদের কৌশলগত এজেন্ডার অংশ। প্রয়োজন পড়লে আমরা তা বাস্তবায়ন করব।”
এই বক্তব্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি-কে আরও বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
শক্তি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
ইসরায়েলের জুনের ১৩ তারিখে ইরানে হামলার পর থেকেই বিশ্ব শক্তি বাজারে উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে।
এরই মধ্যে—
ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১০% বেড়েছে
ব্যারেলপ্রতি দাম ৭৭ ডলার ছাড়িয়েছে
এশিয়ার শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে
According to analysts, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’-এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় পারস্য উপসাগরে ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল। তখন তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হতো, এমনকি মার্কিন নৌবহরও লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল।
১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন আর্নেস্ট উইল পরিচালনা করে তেল ট্যাঙ্কার পাহারা দেয়। কিন্তু ১৯৮৮ সালে এক মর্মান্তিক ঘটনায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ভুলবশত ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ গুলি করে ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন নিহত হন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি সেই ভয়াবহ অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্কভিত্তিক বিশ্বখ্যাত জাহাজ পরিবহন কোম্পানি মার্সক জানিয়েছে, তারা এখনো হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করছে, তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিবৃতিতে বলা হয়,
“আমরা আমাদের জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রয়োজনে বিকল্প রুট বিবেচনা করা হবে।”
এটি স্পষ্ট করে যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কতটা বিপজ্জনক?
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে—
এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি সংকট
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি
উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া
বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি
পশ্চিমা দেশগুলো ইরানকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানালেও তেহরান তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
Conclusion
সব দিক বিবেচনায়, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার হুমকি এখন শুধু একটি কূটনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
