ইসরাইলি সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট: বাড়ছে আত্মহত্যা ও পিএসটিডি
ইসরাইলি সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্য বর্তমানে দেশটির জন্য এক গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা সামরিক অভিযানের সময় এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে সেনাদের মধ্যে আত্মহত্যা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আঘাত–পরবর্তী মানসিক চাপজনিত রোগ (পিএসটিডি) দ্রুত বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বলছে, এই সংকট সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করছে।
যুদ্ধের পটভূমি ও মানসিক চাপ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইল গাজা উপত্যকায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই সংঘাতে সহিংসতা, মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা ছিল নজিরবিহীন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংঘাতের মানসিক প্রভাব এখনো সেনাদের পিছু ছাড়েনি।
যুদ্ধকালীন সময়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়, সহযোদ্ধাদের আহত বা নিহত হওয়া এবং সাধারণ মানুষের বিপুল প্রাণহানি প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর আঘাত হেনেছে।
পিএসটিডি বাড়ার পরিসংখ্যান
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে পিএসটিডি ও অন্যান্য মানসিক রোগের হার প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৮ সালের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্ত সেনার সংখ্যা ১৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গাজা অভিযানে আহত ২২ হাজারের বেশি সেনার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বর্তমানে পিএসটিডিতে ভুগছেন বলে জানানো হয়েছে।
আত্মহত্যা: ভয়াবহ সংকেত
ইসরাইলি পার্লামেন্ট কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত অন্তত ২৭৯ জন ইসরাইলি সেনা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এই সংখ্যা আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আরও উদ্বেগজনক হলো—২০২৪ সালে ইসরাইেলে সংঘটিত মোট আত্মহত্যার প্রায় ৭৮ শতাংশই সংঘাতে অংশ নেওয়া সেনাদের মধ্যে ঘটেছে। মানসিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানসিক আঘাতের কারণ
মনোবিজ্ঞানী রোনেন সিদির নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেনাদের মানসিক সমস্যার প্রধান দুটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুভয়ের মধ্যে থাকা।
দ্বিতীয়ত, নৈতিক আঘাত—অর্থাৎ সংঘাতের সময় এমন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া, যা পরবর্তী সময়ে মানসিক অপরাধবোধ তৈরি করে।
এই দুটি বিষয় একত্রে সেনাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ, অনিদ্রা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা বাড়াচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চাপ
ইসরাইলের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ম্যাকাবির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের আওতায় থাকা সেনাদের ৩৯ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা চাইছেন। এ ছাড়া ২৬ শতাংশ সেনা নিয়মিত উদ্বেগ ও মানসিক চাপের কথা জানিয়েছেন।
সংঘাতে অংশ নেওয়া অনেক সেনা জানিয়েছেন, যুদ্ধ কমে এলেও মানসিক অস্থিরতা তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে।
গাজাবাসীর মানসিক বিপর্যয়
অন্যদিকে, ইসরাইলি অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেছে। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবার সংকটের পাশাপাশি ভয়াবহ মানসিক আঘাতে ভুগছেন গাজার বাসিন্দারা।
ফিলিস্তিনি চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই আতঙ্ক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
Conclusion
ইসরাইলি সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এখন আর উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। আত্মহত্যা ও পিএসটিডি বৃদ্ধির এই চিত্র যুদ্ধের মানবিক মূল্যকে নতুন করে সামনে এনেছে। সংঘাত বন্ধ হলেও মানসিক ক্ষত সারাতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, সহায়তা ও নীতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য।
