গোলাম পরওয়ার মন্তব্য: বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দেওয়ার অভিযোগ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া–ফুলতলা) আসনে ১০–দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর এসব বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে “বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন” মন্তব্যটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
নির্বাচনকে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম হিসেবে দেখছেন গোলাম পরওয়ার
গোলাম পরওয়ার মন্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য উপায় হলো ব্যালট। তিনি বলেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোতে অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, বরং ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্রক্ষমতা ও আইন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তিনি নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ সংগ্রামের একটি পথ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সহিংসতা, সন্ত্রাস কিংবা জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলের ধারণা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জামায়াতে ইসলামী সব সময় নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র ও সরকার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ব্যালটের রাজনীতি বনাম অস্ত্রের রাজনীতি
নির্বাচনী সমাবেশে গোলাম পরওয়ার মন্তব্যে ইতিহাসের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, এক সময় যুদ্ধ হতো তরবারি, তির-ধনুক কিংবা কামান দিয়ে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রামের ধরনও বদলেছে। এখন যুদ্ধ হচ্ছে ব্যালটের মাধ্যমে। জনগণের ভোটই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক কর্মীদের শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত পথে থাকার আহ্বান জানান এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার রাজনীতি পরিহার করার কথা বলেন।
সৎ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার মন্তব্য
গোলাম পরওয়ার মন্তব্যে উঠে আসে সৎ নেতৃত্বের বিষয়টি। তাঁর মতে, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলে সমাজ থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং দমন-পীড়ন অনেকাংশে কমে আসবে। তিনি দাবি করেন, এ কারণেই কিছু মহল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
তিনি বলেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হলে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষিত হবে।
তারেক রহমানের বক্তব্য নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, কোনো মুসলমান যদি আল্লাহ, রাসুল ও আখেরাতে বিশ্বাস করেন, তাহলে তাঁকে কাফের বলা ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
গোলাম পরওয়ার মন্তব্য অনুযায়ী, কাউকে কাফের বলা বড় ধরনের অপরাধ এবং এটি সামাজিক ও ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আঘাত করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
“বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন”—বিতর্কিত মন্তব্য
সবচেয়ে আলোচিত অংশ আসে যখন গোলাম পরওয়ার বলেন,
তিনি ধারণা করেছিলেন যে বিদেশে অবস্থানের কারণে তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিপক্বতা বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে তিনি দেখেছেন, তারেক রহমান এখন “বড় মুফতি” হয়ে গেছেন এবং কে মুসলমান আর কে কাফের—এ বিষয়ে ফতোয়া দিচ্ছেন।
গোলাম পরওয়ার মন্তব্যে স্পষ্টভাবে বলা হয়, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে এমন বক্তব্য দেওয়া সৌজন্য ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী। কারও ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণ করার অধিকার কোনো রাজনৈতিক নেতার নেই।
১৯৭১ সালের ইতিহাস প্রসঙ্গে বক্তব্য
গোলাম পরওয়ার মন্তব্যে ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল। এটি নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিশ্লেষণ হতে পারে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে এবং তাদের গঠনতন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা
গত ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গোলাম পরওয়ার মন্তব্য করেন, এ সময়ে যারা দেশ শাসন করেছে, তাদের কেউই সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত শাসনের দাবি করতে পারবে না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ প্রতিটি সরকারের আমলেই দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং বিরোধী দল দমনের অভিযোগ উঠেছে। এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নৈতিক ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রয়োজন।
ভোটারদের প্রতি আহ্বান
ভোটারদের উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার মন্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, ভোট কেনার জন্য দেওয়া কালোটাকা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। টাকা দিয়ে মানুষের বিবেক কেনা যায় না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ভোট বিক্রি করা মানে নিজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বিক্রি করা। সচেতন ভোটারই পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখতে।
গণসংযোগ ও নির্বাচনী কার্যক্রম
নির্বাচনী সমাবেশ শেষে গোলাম পরওয়ার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকে অংশ নেন। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন এবং নির্বাচনী বার্তা পৌঁছে দেন।
উপসংহার
সার্বিকভাবে গোলাম পরওয়ার মন্তব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ব্যালটের রাজনীতি, ধর্মীয় বক্তব্যের সীমা, অতীত ইতিহাস ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্য নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
