বাংলাদেশের কার্বন মার্কেটে বাড়ছে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ: বনায়ন ও জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনাফসলি জমির পাশেই ইটভাটা, ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ পরিবেশ ও কৃষি
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

বাংলাদেশের কার্বন মার্কেট ঘিরে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। বনায়ন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্বন নির্গমন কমানো এবং আন্তর্জাতিক কার্বন ট্রেডিংয়ে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও এনজিও সম্ভাব্য প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে।

কোন প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে

সরকারি সূত্র জানায়, অস্ট্রেলিয়ার এটিইসি, দক্ষিণ কোরিয়ার ইডব্লিউসি, জাপানের মিটসুই ও সুমিটোমা বর্তমানে বাংলাদেশে কার্বন ট্রেডিং–সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক এনজিও ইকো–সোশ্যাল সলিউশনস ও ভ্যালু নেচার ভেনচারস এবং দেশের আরণ্যক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মাটি অর্গানিক লিমিটেড ও বাংলাদেশ বন্ধু ফাউন্ডেশনও এ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে।

সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৭৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বনায়ন খাতে বড় সুযোগ

বনায়ন খাতে কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বন বিভাগের সঙ্গে ছয়টি প্রতিষ্ঠান উপকূলীয় বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগ্রহ দেখিয়েছে। বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, উপকূলীয় বনায়নের ফলে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর নতুন ভূমি সৃষ্টি হতে পারে, যা কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কৃষি ও জ্বালানি খাতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ

জাপানের মিটসুই কৃষি খাতে পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (AWD) পদ্ধতি প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে। প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে এই পদ্ধতি চালু হলে পানির ব্যবহার কমবে, উৎপাদন বাড়বে এবং মিথেন গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

অন্যদিকে জাপানের সুমিটোমা গ্যাস লাইনের লিকেজ বন্ধ করে মিথেন নির্গমন কমাতে আগ্রহী। অস্ট্রেলিয়ার এটিইসি ও কোরিয়ার ইডব্লিউসি রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের পরিবর্তে ক্লিন কুকিং স্টোভ ব্যবহারের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে।

সরকারের অবস্থান ও ডিএনএর ভূমিকা

কার্বন ট্রেডিং–সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ ও প্রকল্প অনুমোদনের জন্য সরকার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডেজিগনেটেড ন্যাশনাল অথরিটি (ডিএনএ) গঠন করেছে। ডিএনএ বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করবে এবং নিশ্চিত করবে যে প্রকল্পগুলো পরিবেশগত ও সামাজিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য।

বন বিভাগের উপপ্রধান বন সংরক্ষক (পরিকল্পনা) রকিবুল হাসান জানান, বিনিয়োগ হবে সরাসরি অথবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে। জমির ব্যবহার, কার্বন শোষণের পরিমাণ এবং কার্বন ক্রেডিট বণ্টন দর-কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

কার্বন ট্রেডিং কী

কার্বন ট্রেডিং হলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর একটি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা। যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সীমার বেশি কার্বন নির্গমন করে, তাদের কার্বন ক্রেডিট কিনতে হয়। অন্যদিকে যেসব প্রকল্প কার্বন শোষণ বা নির্গমন কমায়, তারা এই কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করতে পারে।

বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে খুব কম অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই বাংলাদেশের কার্বন মার্কেট দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ—দুটোর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জাতীয় অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্যারিস চুক্তির আওতায় জমা দেওয়া সর্বশেষ এনডিসি অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানোর অঙ্গীকার করেছে। সরকার আশা করছে, এই লক্ষ্যমাত্রার ৪০–৫০ শতাংশ কার্বন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে জাতীয় কার্বন রেজিস্ট্রি সিস্টেম তৈরিতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও ভলান্টারি কার্বন মার্কেটে বিনিয়োগ আনতে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে।

বাংলাদেশের কার্বন মার্কেটের সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক নীতিমালা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের কার্বন মার্কেট শুধু পরিবেশ সুরক্ষায় নয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে।

দ্বারা Saimun Sabit