মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে ভারতের রাজনীতি ও ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসির ভারত সফরকে কেন্দ্র করে বিপুল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্রাক্তন সংসদ সদস্য অর্জুন সিং। তার দাবি, পুরো আয়োজনের আড়ালে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি রুপি আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা তদন্ত ছাড়া ধামাচাপা দেওয়া উচিত নয়|
এই অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) তদন্তের জোরালো দাবি উঠেছে।
মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ কীভাবে সামনে এলো
গত ১৩ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের সল্টলেক স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির আগমন ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে আয়োজনের স্বচ্ছতা নিয়ে। আয়োজক সংস্থা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ হন দর্শকরা।
এই ঘটনার পর বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ অর্জুন সিং প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, মেসিকে ভারতে আনার নামে প্রায় ১০০ কোটি রুপির দুর্নীতি হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, আয়োজনের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বহু গুণ বেশি অর্থ দেখানো হয়েছে।
অর্জুন সিংয়ের বিস্ফোরক বক্তব্য
এক প্রতিক্রিয়ায় অর্জুন সিং বলেন,
“স্টেডিয়াম হয়তো এক রুপি বা পাঁচ রুপি দিয়ে প্রতীকীভাবে বুক করা হয়েছে, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের আপত্তি হয়েছে অন্য জায়গায়।”
তিনি অভিযোগ করেন,
১০ রুপির পানির বোতল ১৫০–২০০ রুপিতে বিক্রি করা হয়েছে
মাঠে দর্শকদের সঙ্গে চরম অব্যবহার করা হয়েছে
মেসিকে কার্যত ‘চুরি করে’ নিয়ে যাওয়া হয়েছে
তার ভাষায়,
“মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। কোটি কোটি রুপি খাওয়া হয়েছে।”
ইডি তদন্ত কেন জরুরি—অর্জুন সিংয়ের যুক্তি
মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে অর্জুন সিং ইডি তদন্তের দাবি তুলে বলেন,
“কী চুক্তি হয়েছিল, কার সঙ্গে হয়েছিল, কত টাকা খরচ হয়েছে, কত লাভ হয়েছে—সবকিছু জনসমক্ষে আসা দরকার।”
তার মতে,
বিদেশি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের আশঙ্কা রয়েছে
সরকারি অনুমোদনের অপব্যবহার হতে পারে
জনগণের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ছিল না
সল্টলেক স্টেডিয়ামের বিশৃঙ্খলার বিস্তারিত চিত্র
১৩ ডিসেম্বর সল্টলেক স্টেডিয়ামে মেসির আগমন ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নজিরবিহীন। মেসি মাঠে ছিলেন মাত্র ২০ মিনিট। সেই সময় তাকে ঘিরে ছিলেন প্রায় ৮০ জন মানুষ।
মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ছাড়াও পুলিশের একটি বড় বলয় মাঠে উপস্থিত ছিল। আয়োজক শতদ্রু দত্ত বারবার অনুরোধ করলেও কেউ মেসির আশপাশ থেকে সরে যাননি।
ফলে হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কাটা দর্শকরা মেসিকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাননি।
পানির বোতল নিয়ে দর্শকদের ক্ষোভ
মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ আরও জোরালো হয় পানির বোতল বিক্রির ঘটনায়।
যেখানে—
বোতল নিয়ে ঢোকার অনুমতি ছিল না
২০ রুপির পানির বোতল বিক্রি হয়েছে ১৫০ রুপিতে
এই বিষয়টি দর্শকদের ক্ষোভে আগুনে ঘি ঢালে। এক পর্যায়ে দর্শকরা ‘বু’ করতে শুরু করেন এবং বোতল ছুড়তে থাকেন মাঠে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, মাঠ ছাড়েন মেসি
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেসিকে টানেল দিয়ে মাঠ থেকে বের করে নেওয়া হয়। এরপর রেলিংয়ের গেট ভেঙে দর্শকরা মাঠে ঢুকে পড়েন।
গ্যালারি থেকে—
বাকেট সিট ভেঙে ছোড়া হয়
ফ্লেক্স ছেঁড়া হয়
ভিআইপি চেয়ারে আগুন লাগানো হয়
এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে দর্শকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
মাঠে লুটপাট ও ভাঙচুর
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে অনেক দর্শক গোলপোস্টের জাল কেটে ‘স্মৃতিচিহ্ন’ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ চেয়ার নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ কার্পেট কাঁধে করে বের হচ্ছেন—এমন দৃশ্যও দেখা যায়।
এই পুরো ঘটনাই মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ কে আরও বিশ্বাসযোগ্য তুলেছে বলে দাবি করে বিরোধীদের।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রতিক্রিয়া
ঘটনার সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সল্টলেক স্টেডিয়ামের দিকেই যাচ্ছিলেন। তবে মেসি মাঠ ছাড়ার পর তিনি স্টেডিয়ামে যাননি।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে তিনি লিওনেল মেসির কাছে ক্ষমা চান এবং ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক ও ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, মেসির মতো কিংবদন্তি ফুটবলারের নাম জড়িয়ে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা ভারতের ক্রীড়া ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইডি তদন্ত শুরু হলে এই ঘটনা নতুন মোড় নিতে পারে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে মেসিকে ভারতে এনে ১০০ কোটি রুপি দুর্নীতির অভিযোগ এখন শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজনের বিতর্ক নয়। এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক জবাবদিহি এবং জনস্বার্থের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইডি তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
