আইসিইর গুলিতে মার্কিন নাগরিক নিহত: যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ ও নিন্দা
যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে আইসিইর গুলিতে মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী ফেডারেল সংস্থা আইসিই (ICE)-এর এজেন্টদের গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর মিনিয়াপোলিসসহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নেতারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
মিনিয়াপোলিসে আইসিইর অভিযানে প্রাণহানি
স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার মিনিয়াপোলিসে আইসিই এজেন্টরা ৩৭ বছর বয়সী অ্যালেক্স প্রেটি নামের এক মার্কিন নাগরিককে আটক করার সময় গুলি চালান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আইসিই এজেন্টরা তাঁকে মাটিতে ফেলে পেছন দিক থেকে একাধিকবার গুলি করেন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার মাধ্যমে চলতি মাসে মিনিয়াপোলিসে আইসিইর গুলিতে মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার সংখ্যা দাঁড়াল দুইয়ে। এর আগে একই মাসের শুরুতে রেনি গুড নামের এক নারী আইসিইর গুলিতে নিহত হন।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
প্রেটির মৃত্যুর একদিন আগেই মিনিয়াপোলিসে প্রায় ১০ হাজার মানুষ তীব্র ঠান্ডা উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসনবিরোধী নীতি ও আইসিইর অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
প্রেটিকে গুলি করে হত্যার পর সেই বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। শত শত বিক্ষোভকারী সংশ্লিষ্ট এলাকায় জড়ো হন এবং আইসিইর সশস্ত্র ও মুখোশধারী এজেন্টদের মুখোমুখি হন।
বিক্ষোভ দমনে কাঁদানে গ্যাস ও গ্রেনেড
বিক্ষোভ চলাকালে আইসিই এজেন্টরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ফ্ল্যাশব্যাং গ্রেনেড ছোড়েন। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মিনিয়াপোলিস পুলিশ ও অঙ্গরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। ফেডারেল এজেন্টরা এলাকা ছাড়ার পর শনিবার রাতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও বিক্ষোভকারীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে রাস্তায় অবস্থান করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ
এই ঘটনার জেরে শুধু মিনিয়াপোলিস নয়, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি ও সান ফ্রান্সিসকোসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আইসিইর কার্যক্রমকে “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ” হিসেবে আখ্যা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের কারণ
মিনিয়াপোলিসের স্থানীয় বাসিন্দারা আগে থেকেই আইসিইর একাধিক কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে—
রেনি গুডের হত্যা
এক মার্কিন নাগরিককে বাড়ি থেকে শর্টস পরা অবস্থায় আটক
স্কুলশিক্ষার্থীদের আটক করার অভিযোগ
এই ঘটনাগুলো স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে।
সংযমের আহ্বান স্থানীয় কর্মকর্তাদের
মিনিয়াপোলিসের পুলিশপ্রধান ব্রায়ান ও’হারা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন,“দয়া করে আমাদের শহরকে ধ্বংস করবেন না।”
তবে বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, বিচার ও জবাবদিহিতা ছাড়া তাঁরা আন্দোলন থেকে সরে আসবেন না।
ফেডারেল ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে উত্তেজনা
আইসিইর গুলিতে মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ফেডারেল ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম দাবি করেন, নিহত ব্যক্তি এজেন্টদের ওপর হামলা করেছিলেন।
ফেডারেল কর্মকর্তারা জানান, প্রেটির কাছে একটি আগ্নেয়াস্ত্র ছিল এবং সেই অস্ত্রের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
ফেডারেল দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন
তবে স্থানীয় নেতারা এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজ বলেন,
“আমি বিভিন্ন দিক থেকে ভিডিও দেখেছি। ঘটনাটি ভয়াবহ এবং গভীরভাবে উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও বলেন, ঘটনার তদন্তে ফেডারেল সরকারের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখা যায় না এবং অঙ্গরাজ্য সরকার নিজেই তদন্ত পরিচালনা করবে।
তদন্তে বাধার অভিযোগ
মিনেসোটা অপরাধ তদন্ত ব্যুরোর প্রধান ড্রু ইভান্স অভিযোগ করেন, তদন্ত শুরুর সময় ফেডারেল এজেন্টরা তাঁদের কাজে বাধা দিয়েছেন।
অন্যদিকে মিনিয়াপোলিস পুলিশপ্রধান জানান, নিহত ব্যক্তির কাছে বৈধ অস্ত্র থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অপরাধের রেকর্ড ছিল না। কেবল কিছু ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল।
অভিযান বন্ধের দাবি
গভর্নর টিম ওয়ালজসহ স্থানীয় নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে প্রশ্ন তুলে বলেন,
“এই অভিযান বন্ধ হতে আর কত মার্কিন নাগরিককে মারা যেতে হবে?”
ট্রাম্পের পাল্টা অভিযোগ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, মেয়র ও গভর্নরের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, আইসিইর গুলিতে মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি, মানবাধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তদন্তের ফলাফল ও সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা দেশ।
