ইরানের ৫ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ৫ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এই কর্মকর্তারাই প্রধান পরিকল্পনাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, সহিংস দমননীতি এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।
এই পদক্ষেপকে ইরানের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবরটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় কারা এলেন
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বিবৃতিতে জানানো হয়, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন—
সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির সচিব
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা
ইরানের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমান্ডার
মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর্মকর্তারাই বিক্ষোভ দমনের নকশা তৈরি এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ফলে ইরানের ৫ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র কড়া বার্তা দিয়েছে।
ফারদিস কারাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা
ব্যক্তিদের পাশাপাশি ইরানের ফারদিস কারাগারকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, এই কারাগারে আটক নারীরা নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং মর্যাদাহানিকর আচরণের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এই কারাগারকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরানে রাষ্ট্রীয় দমননীতি এখন শুধু রাজনৈতিক পর্যায়েই নয়, বরং মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
ইরানের নেতাদের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা
এক ভিডিও বার্তায় মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের শীর্ষ নেতাদের কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন। তিনি বলেন,
ইরানি নেতারা জনগণের কাছ থেকে আত্মসাৎ করা অর্থ বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নিচ্ছেন—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ অবগত।
তার ভাষায়,
“ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে যেমন ইঁদুর পালায়, তেমনি আপনারাও জনগণের অর্থ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা আপনাদের এবং সেই অর্থ—দুটোরই খোঁজ রাখছি।”
এ বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরানের ৫ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা কেবল প্রতীকী নয়, বরং আর্থিক ব্যবস্থাকেও লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ও জাতিসংঘের অবস্থান
নিউইয়র্কে জাতিসংঘে ইরানের মিশনের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অতীতে ইরানের শাসকগোষ্ঠী দেশটির অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে।
ইরানের দাবি, বিদেশি শক্তিগুলোই দেশটিতে অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।
বিক্ষোভের পেছনের কারণ কী
ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতা শুরু হয় লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে। পরবর্তীতে এই বিক্ষোভ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন HRANA জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত—
২,৪৩৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত
সরকারপন্থী ১৫৩ জন ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত
এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, সরকার অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তিনি জানান,
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হবে।
আরও ১৮ জনের ওপর নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানের ৫ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েই থামেনি। ট্রেজারি বিভাগ আরও ১৮ জন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রির অর্থ পাচারে জড়িত ছিলেন। এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল একটি ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতি
এই পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির সর্বশেষ ধাপ। এর মূল লক্ষ্য—
ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনা
দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা
যদিও ইরান বরাবরের মতোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
