জাতীয় কবির সমাধির পাশে সমাহিত শহীদ হাদি
জাতীয় কবির সমাধির পাশে সমাহিত শহীদ হাদি—এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে থাকবে। শনিবার (২০ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলের কাছেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে।
জাতীয় কবির সমাধির পাশে সমাহিত শহীদ হাদি: দাফনের মুহূর্ত
শনিবার বিকেল তিনটার দিকে হাদির মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছায়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলের সামনের প্রধান ফটক দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সটি প্রবেশ করানো হয়। অ্যাম্বুল্যান্সের ওপর ছিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ, সাদিক কায়েমসহ তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধারা।
অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছানোর মাত্র পাঁচ মিনিট পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান কেন্দ্রীয় মসজিদের ভেতর দিয়ে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেন। পুরো এলাকায় তখন শোক, শ্রদ্ধা ও নীরব কান্নার আবহ সৃষ্টি হয়।
সকাল থেকেই কবর প্রস্তুতি
শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকেই জাতীয় কবির সমাধির পাশে সমাহিত শহীদ হাদির কবর খননের কাজ শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল টিম দাফন অনুষ্ঠানের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাবির প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তারা।
জাতীয় কবির সমাধির পাশে সমাহিত শহীদ হাদি: জানাজার আগে জনস্রোত
এর আগে শনিবার দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয় শহীদ ওসমান হাদির জানাজা। সকাল থেকেই সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হতে থাকেন।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণ জনগণকে দক্ষিণ প্লাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়। আর্চওয়ে গেট দিয়ে ছাত্র-জনতা জানাজাস্থলে প্রবেশ করেন।
আবেগঘন জানাজা ও রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি
লাখো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজ পড়ান শহীদ হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। জানাজা চলাকালে উপস্থিত অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারেও দেশের মানুষ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
হত্যাকাণ্ড ও চিকিৎসার লড়াই
গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
রাজনৈতিক পরিচয় ও জনমানসে প্রভাব
শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী। তরুণ সমাজের কাছে তিনি ছিলেন প্রতিবাদের সাহসী কণ্ঠস্বর। জাতীয় কবির সমাধির পাশে সমাহিত শহীদ হাদি—এই ঘটনা তার জনপ্রিয়তা ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন অনেকেই।
