ভূমিকা
নতুন প্রজন্মই একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি ও ভবিষ্যতের কারিগর। অথচ বাংলাদেশে সেই প্রজন্ম প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য বিপদের মুখে পড়ছে। নিরাপদ সড়কের দাবি আজ আর কোনো আন্দোলনের স্লোগান নয়, এটি একটি মানবিক প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য, সড়ক দুর্ঘটনাকে আমরা এমনভাবে মেনে নিতে শিখেছি যে, প্রতিদিনের মৃত্যুর খবর আর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুমৃত্যু: ভয়াবহ বাস্তবতা
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে এক হাজারের বেশি শিশু। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৪ শতাংশ শিকার শিশু। এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি হাজারো পরিবারের আজীবনের কান্না ও শূন্যতার গল্প।
শহরের তুলনায় গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে শিশুমৃত্যুর হার বেশি। কারণ এসব সড়ক বসতবাড়ির খুব কাছ দিয়ে গেছে, যেখানে নেই কোনো গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নেই ট্রাফিক পুলিশের তদারকি। ফলে অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া চলাচল শিশুদের জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
অব্যবস্থাপনা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ
যে সড়কে যে ধরনের যান চলাচলের অনুমতি নেই, সেখানেও নিয়মিত চলছে অবৈধ যানবাহন। লাইসেন্সবিহীন চালক, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি এবং ফিটনেসবিহীন যান চলাচল যেন এখন স্বাভাবিক বিষয়। তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা সড়ক দুর্ঘটনার হার আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—দুর্ঘটনার পর দায়ী চালক ও যানবাহনের মালিকেরা সহজেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। ফলে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার যে ন্যূনতম বার্তাটি দেওয়ার কথা, সেটিও ব্যর্থ হচ্ছে।
শিশুবান্ধব নয় আমাদের সড়ক ব্যবস্থা
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা কোনোভাবেই শিশুবান্ধব নয়। উন্নত দেশগুলোতে শিশুদের ‘নাজুক সড়ক ব্যবহারকারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্কুল জোনে কঠোর গতিসীমা, বিশেষ ট্রাফিক গার্ড, নিরাপদ ফুটপাত ও জেব্রা ক্রসিং বাধ্যতামূলক।
অথচ আমাদের দেশে অপরিকল্পিতভাবে মহাসড়কের পাশেই গড়ে উঠছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নেই স্কুলবাস ব্যবস্থা, নেই নিরাপদ রাস্তা পারাপারের সুযোগ। এমনকি পাঠ্যবইয়ে দেওয়া সড়ক সচেতনতার শিক্ষাও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা হয় না।
অবৈধ যানবাহনের দাপট: নীরব ঘাতক
বর্তমানে নিরাপদ সড়কের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ তিন চাকার যান, অটোরিকশা, নছিমন ও ভটভটি। এসব যানবাহনের বেশিরভাগ চালকের কোনো লাইসেন্স নেই, নেই যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট।
শিশুদের পথচারী হিসেবে মৃত্যুর পেছনে এসব যানবাহনের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
সড়ক দুর্ঘটনার সামাজিক প্রভাব
একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না; এটি একটি পরিবারকে মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কোনো সান্ত্বনা বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এই ট্রমা আজীবন বয়ে বেড়াতে হয় বাবা-মাকে।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে করণীয়
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তার কঠোর প্রয়োগ। বিশেষ করে—
স্কুল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রক বসানো
লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করা
শিশুদের জন্য ব্যবহারিক ট্রাফিক শিক্ষা চালু করা
দুর্ঘটনায় দায়ী চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা
অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান
উপসংহার
আমরা আর কোনো মায়ের কোলে নিথর সন্তানের লাশ দেখতে চাই না। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের সব দাবি অর্থহীন হয়ে যাবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব। এখনই সময়, নিরাপদ সড়ককে বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করার।
