বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় প্রতীক, অতিরিক্ত সচিবের পদ সংকট ও প্রশাসনিক স্থবিরতা বিষয়ক সংবাদচিত্রনিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা দ্রুত কমছে, এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেখা দিচ্ছে স্থবিরতা।
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

অতিরিক্ত সচিবের পদ সংকট: প্রেক্ষাপট ও বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবের পদ সংকট এখন একটি গুরুতর সমস্যায় রূপ নিয়েছে। নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় একদিকে যেমন অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা দ্রুত কমছে, অন্যদিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কর্মকর্তার অভাবে কার্যত ধুঁকছে। প্রশাসনের মধ্যম স্তরের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি দুর্বল হয়ে পড়ায় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমে দেখা দিচ্ছে স্থবিরতা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪১৮টি। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ৩২৩ জন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আগামী এক মাসের মধ্যে অবসর ও অন্যান্য কারণে এই সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ২৬০ জনে। অর্থাৎ, দেড় শতাধিক অতিরিক্ত সচিবের পদ শূন্য হয়ে পড়লেও তা পূরণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

কেন বাড়ছে অতিরিক্ত সচিবের পদ সংকট

প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিয়মিত পদোন্নতির অভাবই অতিরিক্ত সচিবের পদ সংকটের মূল কারণ। সাধারণত প্রতি বছর একবার হলেও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি।

সর্বশেষ ২০২৩ সালের মে মাসে ১৮তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর ১৯ মাস পেরিয়ে গেলেও ২০তম ব্যাচকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। যদিও একাধিকবার সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (SSB) সভার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

নির্বাচন ও প্রশাসনিক গা ছাড়া ভাব

এবারের জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনে এক ধরনের গা ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার পদোন্নতি দিতে অনাগ্রহী ছিল—এমন ধারণা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

বর্তমানে তফসিল ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী পদোন্নতি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। তবে প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনগতভাবে পদোন্নতির কোনো বাধা নেই। শুধুমাত্র রেওয়াজকে অজুহাত করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলো ফাঁকা রাখা হচ্ছে।

অতীত ব্যাচগুলোর পদোন্নতির তুলনামূলক চিত্র

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগের বিসিএস ব্যাচগুলো তুলনামূলকভাবে কম সময়েই অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছে।

৯ম ব্যাচ: যুগ্ম সচিব হওয়ার ২ বছর ৮ মাস পর
১০ম ব্যাচ: ৩ বছর ৪ মাস পর
১১তম ব্যাচ: ২ বছর ১১ মাস পর
১৩তম ব্যাচ: ২ বছর ৯ মাস পর
১৫তম ব্যাচ: সাড়ে ৩ বছর পর
১৭তম ব্যাচ: ৩ বছর ১১ মাস পর
১৮তম ব্যাচ: ২০২৪ সালে, সময় লেগেছে ৩ বছর ১০ মাস

 

কিন্তু ২০তম ব্যাচ যুগ্ম সচিব হওয়ার চার বছর পার হলেও এখনো অতিরিক্ত সচিব হয়নি। এর আগের ব্যাচ পদোন্নতি পেয়েছে প্রায় ১৮ মাস আগেই। এই বৈষম্য নিয়ে ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ, হতাশা ও ক্ষোভ

প্রশাসনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব

অতিরিক্ত সচিবের পদ সংকট সরাসরি প্রশাসনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে—

প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে জটিলতা
কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ

 

দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন 

সংশ্লিষ্টরা।

কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া ও মন্ত্রণালয়ের নীরবতা

এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হক-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ সরকার বলেন,
“এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”

এই ধরনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে বলে মনে করছেন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট মহল।

করণীয় কী হতে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—

অবিলম্বে SSB সভা ডেকে পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা
রেওয়াজ নয়, আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া
অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়মিত ও সময়মতো পদোন্নতির রোডম্যাপ তৈরি
নির্বাচনী সময়েও প্রশাসনের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা

উপসংহার

সব মিলিয়ে বলা যায়, অতিরিক্ত সচিবের পদ সংকট এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ না করলে প্রশাসনের কার্যকারিতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

দ্বারা Saimun Sabit

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।