রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে আঘাত হিসেবে দেখছে ভারত—বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক কাছারি বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দেশটি। এই ঘটনাকে ‘জঘন্য’ উল্লেখ করে ভারতের পক্ষ থেকে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ভারতের মতে, এটি শুধু একটি স্থাপনার ক্ষতি নয়; বরং রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন ও উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর সরাসরি আঘাত।
শাহজাদপুর কাছারি বাড়ি: ঐতিহাসিক গুরুত্ব
শাহজাদপুরের কাছারি বাড়ি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জমিদারি তদারকির সময় তিনি একাধিকবার এখানে অবস্থান করেন এবং সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। এই স্থাপনাটি রবীন্দ্রনাথের ভাবনা, দর্শন ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
এ কারণেই কাছারি বাড়িতে হামলার ঘটনাকে অনেকেই রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে আঘাত হিসেবে দেখছেন।
🇮🇳 ভারতের তীব্র নিন্দা ও প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানায়। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু ভারতের নন—তিনি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক।
ভারতের মতে, বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটায় স্পষ্ট হচ্ছে যে উগ্রপন্থীরা পরিকল্পিতভাবে সহনশীলতার প্রতীকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
রণধীর জয়সোয়ালের কড়া বার্তা
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন,
এই হামলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের সহনশীল ও সমন্বয়মূলক সংস্কৃতির প্রতীকগুলো যেভাবে ধ্বংসের শিকার হচ্ছে, শাহজাদপুরের ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। তাঁর ভাষায়, এই ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে আঘাত।
বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আহ্বান
ভারত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দেশটি।
ভারতের মতে, এসব হামলা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—এগুলো আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও যুক্ত।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ভারতের অবস্থান
ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্য প্রসঙ্গেও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
তিনি স্পষ্ট করেন, দুই দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক—যা রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে আঘাতের মতো ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের দিল্লি সফর প্রসঙ্গ
সজীব ওয়াজেদ জয়ের দিল্লি সফর নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই এবং সংবাদটির সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে আঘাত দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি মানবতা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের কথা বলেছেন।
তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনায় হামলা হলে স্বাভাবিকভাবেই তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।
সামনে করণীয়
এখন মূল প্রশ্ন—বাংলাদেশ সরকার কীভাবে এই ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, শাহজাদপুরে কাছারি বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে আঘাত। ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে, এই বিষয়টি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এখন দেখার বিষয়—এই ঘটনার বিচার ও প্রতিরোধে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
