সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট নিয়ে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার আন্দোলনসমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট নিরসনে ভূমি অধিকার ও উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ সমাবেশ।
WhatsApp
WhatsApp Channel
Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট: বাস্তবতা ও মানবিক বিপর্যয়

সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট বাংলাদেশে একটি দীর্ঘদিনের অবহেলিত সমস্যা। ভূমি দখল, জাল দলিল, আদালতের রায় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণে এসব জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং গ্রামে কোল জাতিসত্তার পাঁচটি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়ে তারই প্রমাণ দিয়েছে। গত বছরের ২৭ অক্টোবর তাঁদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলে তাঁরা আশ্রয় নেন পাশের একটি বাঁশঝাড়ে। সরকারি সহায়তায় পাওয়া কিছু টিন দিয়ে কেবল ছাপরা দেওয়া সম্ভব হয়, কিন্তু শীত ও দুর্ভোগ তাঁদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

উচ্ছেদের পেছনের আইনি জটিলতা

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর একজন রুমালী হাসদা জানান, তাঁরা প্রায় ২৫ বছর ধরে ওই জমিতে বসবাস করছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল জমিটি আত্মীয়দের নামে রেকর্ডভুক্ত। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীরা জমিটি রেজিস্ট্রি করে আদালতে মামলা করেন। দারিদ্র্য ও আইনি অজ্ঞতার কারণে কোল পরিবারগুলো মামলা চালাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়—যা সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট আরও গভীর করেছে।

প্রশাসনের ভূমিকা ও মানবিক প্রশ্ন

গোদাগাড়ী উপজেলার ইউএনও মো. নাজমুস সাদাত স্বীকার করেন, আদালতের রায় অনুযায়ী উচ্ছেদ করা হলেও পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মানবিক নয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো স্থায়ী পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই প্রশাসনিক দুর্বলতাই সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট দীর্ঘস্থায়ী করছে।

গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমানের ২০২৪ সালের গবেষণা অনুযায়ী, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের প্রায় সব সূচকেই তারা পিছিয়ে রয়েছে। আইনি সুরক্ষা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই, যা সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট সমাধানের পথে বড় বাধা।

মধুপুরে গারোদের উচ্ছেদ আতঙ্ক

টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে বসবাসকারী গারো জনগোষ্ঠীও উচ্ছেদের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সংরক্ষিত বন ও ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণার কারণে তাঁদের ১৩টি গ্রাম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অথচ বনভূমির বড় অংশ বাণিজ্যিক চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ভূমি ব্যবস্থাপনার দ্বিচারিতা তুলে ধরে।

উপকূলে রাখাইনদের অস্তিত্ব সংকট

পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে রাখাইনদের অবস্থা আরও করুণ। একসময় ২৩৭টি গ্রাম থাকলেও জাল দলিল ও দখলদারির কারণে আজ তা প্রায় বিলুপ্ত। ১৯৪৮ সালে ৫০ হাজার রাখাইন থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা নেমে এসেছে কয়েক হাজারে। এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখায় সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট কতটা ভয়াবহ।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা অনুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জমি হস্তান্তরে রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এই আইন কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিসংকট সমাধান সম্ভব নয়।

দ্বারা Saimun Sabit

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।