উপদেষ্টা ও সচিবের নেতৃত্বে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নতুন যুগ
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা, সরকারের কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব মূলত এই মন্ত্রণালয়ের ওপরই ন্যস্ত। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এক নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মৌলিক ভূমিকা
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম এবং সরকারের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম—সব পর্যায়ে তথ্যের সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
তথ্য অধিদপ্তর (PID): সরকারি তথ্যের প্রধান কেন্দ্র
তথ্য অধিদপ্তর বা পিআইডি হলো সরকারের তথ্য প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু। প্রধান তথ্য অফিসারের নেতৃত্বে এই দপ্তরটি সরকারি সিদ্ধান্ত, নীতিমালা ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, ফটোগ্রাফ এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে গণমাধ্যমে সরবরাহ করে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ থেকে শুরু করে উপদেষ্টাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পর্যন্ত সবকিছুই পিআইডির মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ বেতার: প্রত্যন্ত অঞ্চলের নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশ বেতার দেশের প্রাচীনতম রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম। যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি বা ইন্টারনেটের সীমিত উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে বেতারই মানুষের প্রধান তথ্যের উৎস। কৃষি পরামর্শ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান এবং দুর্যোগকালীন সতর্কবার্তা প্রচারে বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশ টেলিভিশন (BTV): রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের দৃশ্যমান দলিল
বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উন্নয়নমূলক প্ল্যাটফর্ম। জাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ, ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান সম্প্রচার এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভিজুয়াল ডকুমেন্টেশন বিটিভির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। বর্তমান সময়ে বিটিভিকে আধুনিক ও জনবান্ধব করে তুলতে নানামুখী সংস্কার কার্যক্রম চলছে।
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহ
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (DFP) সরকারি প্রকাশনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং সংবাদপত্রের সার্কুলেশন যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করে। পাশাপাশি গণযোগাযোগ অধিদপ্তর গ্রামীণ পর্যায়ে উঠান বৈঠক, ভ্রাম্যমাণ সিনেমা শো এবং লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সরকারের বার্তা সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়।
সাংবাদিকতা উন্নয়নে পিআইবি ও প্রেস কাউন্সিল
সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (PIB) প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সংবাদপত্রের নৈতিকতা রক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে গণমাধ্যমের মান বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চলচ্চিত্র ও সংবাদ সংস্থার অবদান
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC) দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (BFTI) মিডিয়া বিষয়ক উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। এছাড়া বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) দেশ-বিদেশের সংবাদ সংগ্রহ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরবরাহ করছে।
নতুন নেতৃত্বে পরিবর্তনের সূচনা
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সচিব বেগম মাহবুবা ফারজানা। এই দুইজন দক্ষ নারী নেতৃত্ব মন্ত্রণালয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন।
উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের দৃষ্টিভঙ্গি
খ্যাতিমান আইনজীবী ও পরিবেশকর্মী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বরাবরই স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে সোচ্চার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিতর্কিত আইনের সংস্কারে তার অবস্থান গণমাধ্যম মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তার বিশ্বাস, তথ্যের অবাধ প্রবাহই একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রধান হাতিয়ার।
সচিব বেগম মাহবুবা ফারজানার প্রশাসনিক দক্ষতা
মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে সচিব বেগম মাহবুবা ফারজানা তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে দপ্তরগুলোর কার্যক্রমে গতি এনেছেন। বিটিভি ও বেতারের আধুনিকায়ন, বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
গণমাধ্যম স্বাধীনতা ও তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এখন আর শুধুমাত্র সরকারি প্রচারণার কেন্দ্র নয়। তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা, অনলাইন পোর্টালের সহজ নিবন্ধন এবং সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উপসংহার
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দর্পণ। উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সচিব বেগম মাহবুবা ফারজানার দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় এই মন্ত্রণালয় একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তুলতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিটিভি থেকে বাসস—সব সংস্থাই এখন স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের নতুন মানদণ্ড স্থাপনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
