Homeসর্বশেষইসরায়েল-তুরস্ক সংঘাত কি আসন্ন? সিরিয়াকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ

ইসরায়েল-তুরস্ক সংঘাত কি আসন্ন? সিরিয়াকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ

WhatsApp WhatsApp Channel Join Now
Telegram Telegram Channel Join Now

সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, হামলাটি শুধু সিরিয়ার মাটিতে আরেকটি ইসরায়েলি সামরিক অভিযান নয়—এর কেন্দ্রে রয়েছে তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি এবং দুই ন্যাটো-সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি।

১৮ আগস্ট ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান আবু আল-দুহুর ঘাঁটিতে হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, সেখানে তুরস্কের সামরিক সদস্য ও সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছিল এবং সেটিকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে। তুরস্ক অবশ্য এমন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক হামলাটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং ইঙ্গিত দেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তুরস্ক-ইসরায়েল সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য?

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ইসরায়েল যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলা চালিয়েছে, সেটি কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল?

টম বারাকের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার প্রায় ছয় দিন আগে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছিল যে তুরস্ক হয়তো ওই এলাকায় সামরিক সরঞ্জাম বা সদস্য পাঠাতে পারে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের অনুসন্ধানের পর তুরস্কের এমন কোনো মোতায়েনের প্রমাণ পায়নি।

এখানেই ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যদি একই গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তাহলে ইসরায়েলের হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বারাক দুটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন। প্রথমত, ইসরায়েল হয়তো তুরস্ককে সংঘাতে জড়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলি সামরিক, গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থেকেও হামলাটি হয়ে থাকতে পারে।

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত এটিকে নিশ্চিতভাবে ‘তুরস্ককে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা’ বলা যাবে না। তবে এমন সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন বিশেষ দূতের প্রকাশ্য মন্তব্য ঘটনাটির গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

আঙ্কারা কেন সরাসরি জবাব দিচ্ছে না?

ইসরায়েলি হামলার পর তুরস্ক কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ করলেও সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথে যায়নি। এটিই সম্ভবত আঙ্কারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

কারণ, তুরস্ক জানে—সিরিয়ায় তার সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলও সিরিয়াকে নিজেদের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে দুই দেশের সামরিক বাহিনী যদি সিরিয়ার একই ভূখণ্ডে সক্রিয় থাকে, তাহলে ছোট একটি ভুল বোঝাবুঝিও দ্রুত বড় সংঘাতে পরিণত হতে পারে।

বিশেষ করে হামলার সময় তুরস্ককে আগে থেকে সতর্ক করা হয়নি। বারাক বলেছেন, ইসরায়েলি বিমান উত্তরের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখে তুরস্ক চাইলে সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিতে পারত। সৌভাগ্যবশত, পরিস্থিতি তখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন তুরস্ক, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন মেকানিজম’ বা সামরিক সংঘর্ষ এড়ানোর সমন্বয় ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে।

আসল দ্বন্দ্ব কি সিরিয়া নিয়ে?

সম্ভবত হ্যাঁ।

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তুরস্ক ও ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমেই বিপরীতমুখী হয়েছে।

তুরস্ক চায় তার দক্ষিণ সীমান্তের পাশে একটি কার্যকর, স্থিতিশীল এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকা সিরিয়া গড়ে উঠুক। সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও রয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল সিরিয়ায় এমন কোনো সামরিক সক্ষমতা তৈরি হতে দিতে চায় না, যা ভবিষ্যতে তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই আসাদ সরকারের পতনের পরও সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্য হয়েছে।

এখানে মূল দ্বন্দ্বটি হলো—তুরস্ক সিরিয়াকে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, আর ইসরায়েল তার নিরাপত্তার স্বার্থে সিরিয়ার সামরিক সক্ষমতা সীমিত রাখতে চায়।

এই দুই অবস্থান যত বেশি মুখোমুখি হবে, ততই তুরস্ক-ইসরায়েল উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে।

ইসরায়েলের জন্যও কি ঝুঁকি বাড়ছে?

নিশ্চয়ই।

ইসরায়েল যদি সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করে, তাহলে সেখানে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে বিভিন্ন সশস্ত্র বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠী।

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এর নজির রয়েছে। লেবাননের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রের দুর্বলতা ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কীভাবে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তাই সিরিয়াকে দুর্বল করে ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদে কতটা নিরাপদ হবে—এটি এখন বড় কৌশলগত প্রশ্ন।

শুধু তুরস্ক-ইসরায়েল নয়, বদলাচ্ছে পুরো আঞ্চলিক কাঠামো

আবু আল-দুহুর হামলাকে শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর পরিবর্তনটি চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।

সম্প্রতি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। চুক্তির মূল ধারণা হলো—এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা এবং সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো।

এই চুক্তি সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী জোট হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব ক্রমেই শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, এটি তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এখানেই পুরোনো আব্রাহাম অ্যাকর্ডস, I2U2 এবং ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর (IMEC)-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক কাঠামোর সঙ্গে নতুন বাস্তবতার পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।

তবে এগুলোকে পুরোপুরি ‘ব্যর্থ’ বা ‘শেষ’ হয়ে গেছে বলা এখনই অতিরঞ্জিত হবে। বরং বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে একক কোনো ইসরায়েলকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর পাশাপাশি তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তার ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির নিজস্ব কৌশলগত উদ্যোগও গুরুত্ব পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। একই সঙ্গে তুরস্কও ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

ফলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠবে।

আবু আল-দুহুর হামলার পর ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে তুরস্ক-ইসরায়েল সামরিক সংঘাত চায় না। বরং সংঘর্ষ এড়াতে একটি যোগাযোগ ও সমন্বয় কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে।

অর্থাৎ, আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে তিনটি বিষয় সামলাতে হবে—ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, তুরস্কের আঞ্চলিক স্বার্থ এবং সিরিয়ার স্থিতিশীলতা।

তাহলে কি ইসরায়েল-তুরস্ক যুদ্ধ আসন্ন?

এই মুহূর্তে সরাসরি যুদ্ধ আসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ নেই।

বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে বলা যায় ‘সংঘাতের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু দুই পক্ষই এখনো সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলছে।’

তুরস্কের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপের জবাব দিতে গিয়ে যেন বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে। অন্যদিকে ইসরায়েলের জন্য প্রশ্ন হলো, সিরিয়ায় তুরস্কের প্রভাব ঠেকাতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কৌশল কতটা কার্যকর এবং এর কূটনৈতিক মূল্য কতটা।

আর যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে निर्णায়ক। কারণ ওয়াশিংটন যদি তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কার্যকর সামরিক যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় সংঘাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

কিন্তু সেই ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে সিরিয়া হয়ে উঠতে পারে তুরস্ক ও ইসরায়েলের পরোক্ষ সংঘাতের প্রধান মঞ্চ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এখন আগের মতো নেই। তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ছে, সৌদি আরব নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করছে, পাকিস্তানও নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেও আগের মডেলের বাইরে নতুন সমীকরণ খুঁজছে।

আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা তাই শুধু একটি বিমান হামলার ঘটনা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি সতর্কসংকেত—যেখানে ইসরায়েলকে আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্বাধীন আঞ্চলিক খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সম্পাদকীয় নোট

এই প্রতিবেদনে মূল বিশ্লেষণটি গালিপ দালাইয়ের আল-জাজিরায় প্রকাশিত বিশ্লেষণ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী ভাষা ও বিশ্লেষণ পুনর্গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে টম বারাকের বক্তব্য, আবু আল-দুহুর হামলার প্রেক্ষাপট এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়গুলো সাম্প্রতিক প্রতিবেদন দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments